ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় সাড়ে ১৬ ঘণ্টা পর ঘোষিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল।
বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন ডাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী সাদিক কায়েম সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং এস এম ফরহাদ সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ী হয়েছেন। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে জয়ী হয়েছেন একই প্যানেলের মহিউদ্দীন খান।
এর আগে ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের জন্য সাড়ে ১৬ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করেছেন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরা। উদ্বিগ্ন ছিলেন দেশ-বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি নাগরিকরা। এ নিয়ে অনেকে সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় ভোট শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় গণনার পালা। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ফলাফল ঘোষণা করার কথা ছিল। তাই বিকাল ৫টা থেকেই সিনেট ভবন ও আশপাশের চত্বরে অবস্থান নেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা। এরপর শুরু হয় তাদের প্রতীক্ষার পালা, তবে সেটি যেন আর শেষই হতে চায় না। এর মধ্যেই একটু পরপরই শোনা যায় ‘উপাচার্য ফল নিয়ে আসছেন’। তখন সবাই নড়েচড়ে বসেন। কেউ কেউ স্লোগান দেন। কিন্তু পরক্ষণেই আশাহত হন। ফল আসে না। অনেকে ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে টেবিলে অথবা দেয়ালে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েন।
মধ্যরাত পার হলেও ফলাফল না পেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। রাত ১টার পর ভেতরে একটু পরপর স্লোগান ধরেন বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা। বাইরে সিনেট ভবনের সামনেও অপেক্ষমান ছিলেন কয়েকশ' মানুষ। তারাও স্লোগান দেন।
রাত ৩টার পর কিছু কিছু হল ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ফলাফল আসতে শুরু করে।
পছন্দের প্রার্থীদের ইতিবাচক ফলাফল শুনে অনেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। ভেতরে অনেকে সংগীত পরিবেশন করতে থাকেন।
রাত পৌনে ৪টায় সিনেট ভবনের সামনে ফলাফল ঘোষণা শুরু করেন নির্বাচন কর্মকর্তারা। প্রথমে ঘোষণা করা হয় হল সংসদের ফলাফল। এরপরই পাঁচটি কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
ভোর পৌনে ৫টায় ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে ভেতরে চলে যান কর্মকর্তারা। জানানো হয় কিছু কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এখনও হাতে আসেনি। এরপর কেটে যায় ভোর। তখনও বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগ ও কানাঘুষা। এদিকে, শাহবাগ ও নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারগুলোতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন কিছু প্যানেলের সমর্থকরা। অবশেষে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ডাকসুর পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের ফলাফল ঘোষণা করেন চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।
মূলত ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ ডাকসুর ২৮টি পদের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সবাই।
ক্ষোভ ও সমালোচনা
তবে এতো বিলম্বে ফলাফল প্রকাশ নিয়ে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সংবাদ পরিবেশন করতে আসা একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদক ভোর ৫টার দিকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতীতে ফলাফল করতে এতো বিলম্ব হয়নি। প্রশাসন চাইলে আরও আগেই ফলাফল ঘোষণা করতে পারতো।’
অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা সমালোচনা হয়। অনেকে মন্তব্য করেন, ‘সামান্য একটি শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচন ফল প্রকাশ করতে এতো বিলম্ব! তাহলে সারা দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল তৈরিতে কতো সময় লাগবে?’
অবশ্য ফলাফল ঘোষণা করতে দেরি হওয়ার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
শীর্ষ তিন পদে বিজয়ী যারা
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ভিপি পদে সাদিক কায়েম পেয়েছেন ১৪ হাজার ৪২ ভোট ও জিএস পদে এস এম ফরহাদ পেয়েছেন ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫ হাজার ৭০৮ ভোট ও জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিম ৫ হাজার ২৮৩ পেয়েছেন ভোট। এজিএসে পদে মহিউদ্দীন খান পেয়েছেন ১১,৭৭২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪ ভোট
এদিকে, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন একাধিক প্রার্থী। ছাত্রদল মনোনীত ভিপি পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, উমামা ফাতেমাসহ বেশিরভাগ প্যানেলের নেতাকর্মীরা নির্বাচন বর্জন করেছেন। তাদের অভিযোগ প্রশাসনের সহযোগিতায় শিবির ভোট নিয়েছে।
ডাকসু নির্বাচনের পরিসংখ্যান
প্রায় ৬ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, বিরতিহীনভাবে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।
এবারের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৯১৫ এবং ছাত্রী ১৮ হাজার ৯৫৯ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি কেন্দ্রে ৮১০টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে।
নির্বাচনে মোট ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৪৭১ জন প্রার্থী। সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে লড়েছেন ৪৫ জন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৯ জন প্রার্থী।
সব মিলিয়ে এবার একজন ভোটারকে ৪১টি করে ভোট দিতে হয়। ভোট নেওয়া হয় ওএমআর ফরমে, ৬ পাতার ব্যালটে। ১৪টি গণনা মেশিনে ৮টি কেন্দ্রে চলে ভোট গণনা। ফলাফল ঘোষণা করা হয় নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে।









