সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি দোকান ভাঙচুরের ভিডিওকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসুর একাংশ এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও স্লোগান পাল্টা-স্লোগান চলেছে।
ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী হাতুড়ি দিয়ে একটি ভাজাপোড়ার দোকান ভাঙছেন। ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলীর নেতৃত্বে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ওই দোকানে চাঁদাবাজি করতে গিয়েছিল এবং দোকানদার ডাকসুকে বিষয়টি জানানোয় ক্ষিপ্ত হয়ে তারা ভাঙচুর চালায়।
ভিডিওতে থাকা বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাঈদ হাসান সাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি গত ২৭ ডিসেম্বরের। তার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আবিদ আব্দুল্লাহর একটি ভাজাপোড়ার দোকান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশের হাকিম চত্বরে, যেটা প্রক্টরিয়াল বডি টিমের সঙ্গে থাকা ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা উচ্ছেদ অভিযানের সময় তুলে দেয়। এমনকি দোকানটির কর্মচারীকে মারধরও করা হয়। এরপর টিএসসির পাশে অন্য একটি দোকান কেন উচ্ছেদ করা হয়নি, তা দেখতে তারা প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন।
ছাত্রদলের এই নেতা আরেকটি ভিডিও দেখান— যেখানে দেখা যাচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির একজন সদস্য দোকান ভাঙছেন এবং অভিযুক্ত ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা সেখানে তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
সাঈদ হাসানের দাবি, তারা কেবল প্রক্টরিয়াল টিমকে ডাক দিয়ে সহযোগিতা করেন। এখানে চাঁদাবাজির কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
যদিও চাঁদাবাজির কারণে এই দোকান ভাঙা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ডাকসুর সদস্য সর্বমিত্র চাকমা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাত ১টার দিকে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ করেন একদল শিক্ষার্থী। বিক্ষোভে মোসাদ্দেক ইবনে আলী বলেন, “আজকে যেই চাঁদাবাজি ধরা পড়েছে তা ছোট একটা উদাহরণ মাত্র, এরকম হাজার হাজার উদাহরণ প্রতিদিন ঘটে। এই চাঁদাবাজরা টিএসসিতে চাঁদাবাজি করে, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে নিউমার্কেট বানিয়ে চাঁদাবাজি করে, নীলক্ষেতে চাঁদাবাজি করে, এবং মেট্রোর নিচে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি করে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি দলীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আমরা মনে করবো, এই চাঁদাবাজির সঙ্গে ছাত্রদল দলীয়ভাবে জড়িত, এবং দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানও এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।”
মোসাদ্দেকদের বিক্ষোভের পরপরই একই জায়গায় বিক্ষোভ করে ছাত্রশক্তি। এতে ছাত্রদলের কর্মীদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। তাদের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু ডাকসু নেতারা কনসার্টে স্পন্সরের মাধ্যমে সিগারেট বিতরণ করছে।
বিক্ষোভে ফজলুল হক মুসলিম হলের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফেরদৌস আইয়াম বলেন, “ক্যাম্পাসে শত শত হকার বসতে পারলে শিক্ষার্থীরা ব্যবসা করলে কেন বাধা দেওয়া হবে? আমরা কোনও চাঁদাবাজকে শেল্টার দেওয়ার জন্য দাঁড়াইনি। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
শহীদুল্লাহ হল সংসদের সদস্য রিয়াদ উস সালেহীন বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আপনি (সর্বমিত্র) এমন একটা পরিচয়ের দিকে নিয়ে গেছেন, মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন নাকি ‘মব’ করে। আপনি যা করেন তার মানে শিক্ষার্থীরাও তাই করে, কারণ আপনি শিক্ষার্থীদের তথাকথিত প্রতিনিধি।” আর এসবের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাদেরকে ‘চাঁদাবাজ’ ট্যাগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরবী বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান বলেন, “ডাকসুর ব্যানারকে অপব্যাবহার করে কিছু মবস্টারদের উত্থান ঘটেছে— যারা ক্যাম্পাসে বিভিন্ন মোরাল পুলিশিং করে বেড়ায়, মবস্টার পরিচয়ে বিভিন্ন অপকর্মও করে বেড়ায়। সর্বমিত্র চাকমা হলো তাদের অন্যতম।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফউদ্দিন আহমেদ জানান, তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না। প্রাথমিকভাবে প্রক্টরিয়াল বডির কাছে কোনও লিখিত অভিযোগও জমা পড়েনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
ভ্রাম্যমাণ দোকান ভাঙচুরের ঘটনায় প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ সংক্রান্ত ভিডিওটি পর্যালোচনা করা হবে।”
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় ডাকসু ভবনের সামনে প্রমাণসহ সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেছারি (এবি জুবায়ের)। অন্যদিকে সকাল ১০টায় প্রক্টরের কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।








