খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও অতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োগের ফলে বাড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। বছরে ৬২ শতাংশই মানুষের মৃত্যু হয় অসংক্রামক রোগে। গত কয়েক বছর ধরে এমন রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। খাবারে ভেজাল মেশানোর ফলে যেসব রোগ হতে পারে সেগুলো হলো, ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, স্থায়ী বক্ষব্যধি, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, স্নায়ুবিক রোগ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও হেলথ বুলেটিন ২০১৫-এ এমন তথ্য প্রকাশ করেছে।
এদিকে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে হৃদরোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। ২০০৯ সালে এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৮ জন। সেখানে ২০১৪ সালে বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৫৩৩ জন মানুষ। একই সময়ে এখানে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। জাতীয় কিডনি রোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালেও অসংক্রামক রোগীর সংখ্যা বিগত বছরগুলোর চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিকারক ইথোফেন, কার্বাইড, রাইপেন ও অন্যান্য রাসায়নিক বোতলের গায়ে লেখা রয়েছে ফল পাকানোর কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। অথচ মৌসুমি ফল আম ও কলা পাকানোর কাজে দেদারসে ফলের আড়তগুলোয় এসব ব্যবহার করছেন ব্যবসায়ীরা। ইথোফেন, কার্বাইড, রাইপেনসহ আরও কিছু রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে দ্রবণ তৈরি করে স্প্রে তৈরি করে ব্যবহার করা হচ্ছে আম ও কলা পাকানোর কাজে। আর এই স্প্রে দেওয়ার দুই/একদিনের মধ্যেই ফল পুরোপুরি হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং পেকে যায়। তবে শুধু আম কিংবা কলা নয়, লিচুর এই সময়টাতে লিচু বড় করার জন্য ব্যবহার করা হয় ম্যাগনল, জোবাস এবং কোরবান নামক কেমিক্যাল। গাছ থেকে যেন লিচু ঝরে না পড়ে, সেজন্য ভারতীয় সিনথেটিক পাইরয়েড ব্যবহার করা হয়। আর ডেসিস, বেল্ট, রিপকট, ফ্লোরা, জিকোজেন ব্যবহার করা হয় লিচুতে পোকার আক্রমণ ঠেকাতে।আর রাইপেন ব্যবহার করা হয় নির্ধারিত সময়ের আগেই লিচু পাকাতে। পুষ্টি ইনস্টিটিউট থেকে জানা যায়, সবজিতে মেশানো হচ্ছে ডাইমেটওয়েট, এসিপামিপ্রিড ও মেথালিক্সিন জাতীয় কীটনাশক। বাজারের খোলা গুঁড়ো হলুদ-মরিচে মেশানো হচ্ছে ক্লোরেপাইরিফিস ও আলফাটক্সিন। দুনিয়াজুড়ে ডিডিটির ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও নানা রকম শুঁটকিতে মেশানো হচ্ছে ডিডিটি ও অ্যালড্রিন।
দেশে প্রচলিত বিশুদ্ধ খাদ্য আইন অনুযায়ী খাদ্যপণ্যে রং মেশানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক জরিপে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মরিচের গুঁড়ায় (প্যাকেটজাত নয়) পাওয়া গেছে বিষাক্ত জৈব উপাদান ও রাসায়নিক রং। দেশের বিভিন্ন স্থানের বাজার থেকে সংগ্রহ করা মরিচের গুঁড়ার ২৭টি নমুনার মধ্যে ২২টিতেই এ ক্ষতিকর উপাদান পেয়েছে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)।জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি (পিএইচএল) প্রধান ডা. শাহনীলা ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাজারে বিক্রি হওয়া যেকোনও খোলা মরিচগুঁড়ো যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হয়, তাহলে তাতে প্রাকৃতিকভাবে আলফাটক্সিন নামক ফাঙ্গাসের আক্রমণ হয়। আর ফাঙ্গাস পড়ে গেলে বিক্রেতারা তাতে মেশান বিষাক্ত রং। তিনি বলেন, আলফাটক্সিন মেশানো খাবার খেলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে সুধান-১-এর কারণে চামড়ায় চুলকানি হয়। যা ক্যান্সারের কারণ হিসেবে কাজ করে।
খাবারের অতিরিক্ত কেমিক্যাল স্প্রে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বলেন, রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন। তিনি বলেন, এসব স্প্রের কারণে দীর্ঘমেয়াদি রোগ হয়ে থাকে। লিচুর বাগানে যে স্প্রে করা হয়, সেটি আমাদের ভাইটাল অর্গান নষ্ট করে দেয়।
এদিকে, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইথোফেন, কার্বাইড, রাইপেন, ক্লোরেপাইরিফিস, ডিডিটি, ও আলফাটক্সিন—এগুলো কোনওটাই খাদ্য ক্যাটাগরিভুক্ত নয়। এগুলো খাওয়ার উপযোগী নয়। এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত খাবার খাওয়ার পর আমাদের মুখ থেকে খাদ্যনালী হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। কোনওটি মুখ থেকে খাদ্যনালী পর্যন্ত অ্যালার্জি ও ক্ষত তৈরি করে। আর পাকস্থলীতে পৌঁছানোর পর প্রদাহ তৈরি করে কিছু কিছু কেমিক্যাল। একইসঙ্গে পাকস্থলীর যে মূল কাজ খাবার হজম করার প্রক্রিয়া, সেটি ব্যাহত করে। লিভারকে বলা হয় শরীরের ল্যাবরেটরি অথচ এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভারের কাজের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় একইসঙ্গে লিভার নিজেও আক্রান্ত হয়।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, এসব রাসায়নিক পদার্থ কিডনিও আক্রমণ করে। ফলে কিডনির কার্যক্ষমতাও কমে যায়। যেসব পদার্থ খাদ্য হিসেবে কোনওকালে বিবেচিত হয়নি সেসব খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়, মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
আরও পড়তে পারেন: নিবন্ধিত দলে ভিড়ছে জামায়াত!
/এমএনএইচ/








