রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের প্রধান সড়কে আবারও হকার বসানোর পায়তারা চলছে। এর নেপথ্যে কাজ করছে কিছু চিহ্নিত চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ। অন্যদিকে এর চরম বিরোধিতা করছেন বিভিন্ন মার্কেটের দোকান মালিকরা। ফলে যেকোনও সময় আবার এ দুই পক্ষের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গুলিস্তান চত্বর, গোলাপশাহ মাজার, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ফ্লাইওভারের নিচে প্রধান সড়কে হকারদের ছড়াছড়ি নেই। তবে সুযোগ পেলে কিছু হকার সড়কের ওপর বসে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে তাদের তুলে দিচ্ছে। সড়ক যখন হকারমুক্ত থাকে তখন যানবাহন বেশ স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারছে। তবে ফুটপাতগুলো যথারীতি হকারদের দখলে রয়েছে। সড়কের কিছু হকার গিয়ে বসেছে কাজী বশির মিলনায়তনের (সাবেক মহানগর নাট্যমঞ্চ) সামনের ফুটপাতে। এ কারণে গুলিস্তানের পথচারীরা চলাফেরা করছে প্রধান সড়ক দিয়ে।
মঙ্গলবার দুপুরে দেখা গেছে, গুলিস্তানের কয়েকজন হকার নেতা সড়কে অবস্থান করছেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা নানা শলা-পরামর্শ করছেন। কখনও পুলিশের সঙ্গে, কখনও বিতাড়িত হকারদের সঙ্গে কথা বলেন তারা।
গুলিস্তান কমপ্লেক্সের সামনে এই নেতাদের মধ্যে মনির নামের এক ব্যক্তি নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্থানীয় নেতা পরিচয় দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রধান সড়কে যাতে কোনও হকার বসতে না পারে সেজন্য আমরা পাহারা দিচ্ছি। তিনি অভিযোগ করেন, সুলতান ও হাসান নামের দুই ব্যক্তি গুলিস্তান এলাকায় হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে। তারাই এখন সড়কের ওপর হকার বসানোর পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের দলীয় পরিচয় আছে নাকি? তারা সব সরকারের সময় চাঁদাবাজি করে। সরকার বদলালে আমরা এ এলাকায় আসতে পারি না। সুলতান-হাসানরা সবসময়ই এখানে থাকে।
মনির বলেন, বৃহস্পতিবার (০৯ জুন) মেয়র ও ডিএমপি কমিশনার এসে পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন- সড়কের ওপর যাতে কোনও হকার বসতে না পারে। এরপরও হকাররা সড়কে বসে কিভাবে? ওই দেখেন পুলিশের গাড়ির সামনেই চাঁদাবাজরা দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশকে যদি টাকা দেওয়া না হয় তাহলে হকাররা কি রাস্তায় বসতে পারে? আপনি বোঝেন না?
জামান নামে ফুটপাতের এক হকার বলেন, প্রধান সড়ক ক্লিয়ার থাকলে ভালো না? আমরা তো চাই মেয়রের নির্দেশ অনুযায়ী সড়ক হকারমুক্ত থাকুক। তিনি বলেন, সড়ক বন্ধ করে বদনাম করছে কিছু হকার। আর ওই বদনামের দায় এসে চাপছে ফুটপাতের হকারদের ওপর।
তোফাজ্জল হোসেন মোল্লা নামের এক হকার নেতা বলেন, গুলিস্তান কমপ্লেক্স থেকে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত সড়কে যানবাহন খুব একটা চলে না। তাই আমরা দাবি করছি আপাতত ঈদ পর্যন্ত সড়কটি বন্ধ করে হকারদের বসতে দিতে।
প্রধান সড়কে হকারদের বসা নিয়ে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দু’দিন হকার ও দোকান মালিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সামনে। কারণ ঢাকা ট্রেড সেন্টারের দোকান মালিকরা চান না তাদের মার্কেটের সামনের সড়কে হকার বসুক। তাই তারা সেদিন হকারদের বাধা দিয়েছিলেন। শুক্রবারের সংঘর্ষের সময় পুলিশ ঢাকা ট্রেড সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ১৯০ জনকে গ্রেফতার করে। এদের বেশির ভাগই ওই মার্কেটের দোকান মালিক ও কর্মচারী।
ঢাকা ট্রেড সেন্টারের দোকান মালিকদের অভিযোগ- কিছু দুর্নীতিবাজ ও পুলিশের সহায়তায় গুলিস্তান ও আশপাশের সড়কের ওপর হকার বসানো হয়। এসব হকারের কাছ থেকে প্রতিমাসে তোলা প্রায় কোটি টাকা, যা তারা ভাগাভাগি করে নেয়। এ কারণে ওইদিন (১০ জুন, শুক্রবার) সংঘর্ষের সময় পুলিশ হকারদের কিছু না বলে মার্কেটের ভেতর হামলা চালিয়ে দোকান মালিক ও কর্মচারীদের আটক করে নিয়ে যায়।
ঢাকা ট্রেড সেন্টার দোকান মালিক সমিতির অফিস কর্মকর্তা মো. নয়ন বলেন, পুলিশ যদি না চায় তাহলে হকাররা এক সেকেন্ডও সড়ক কিংবা ফুটপাতে বসতে পারবে না। কিন্তু মার্কেটের সামনে গিয়ে দেখুন হকাররা কিভাবে ফুটপাত দখল করে নিয়েছে। সমঝোতা হলে হকাররা শিগগিরই প্রধান সড়কেও বসে যাবে- এমন কথা দু’দিন ধরে শোনা যাচ্ছে বলে দাবি করেন নয়ন।
মঙ্গলবার বেলা পৌনে দুইটায় ঢাকা ট্রেড সেন্টার নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে যেতেই এ প্রতিবেদকের দেখা হয় মতিঝিল জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি পেট্রোল) মো. মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে। তখন তিনি সড়কে দাঁড়িয়ে যান চলাচলে শৃঙ্খলার কাজ করছিলেন এবং প্রধান সড়কে যাতে কোনও হকার বসতে না পারে সেটা তদারক করছিলেন।
আলাপকালে এসি মাজহার বলেন, শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনার পর দু’দিন আমরা কিছুটা কম তৎপর থাকি। কিন্তু সোমবার থেকে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছি। এখন কোনও হকারকে প্রধান সড়কে বসতে দিচ্ছি না। তবে ফুটপাতের হকারদের কনসিডার করা হচ্ছে উপরের নির্দেশে। দোকান মালিকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কত অভিযোগই তো শোনা যায়, সব কি সঠিক? আমরা যদি হকারদের সহযোগিতা করতাম তাহলে আজ কি আপনারা এই সড়ক হকারমুক্ত দেখতেন?
/ওএফ /এএইচ/
আরও পড়ুন-








