জঙ্গিবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে লাখো মুফতি ওলামা ঈমামের স্বাক্ষর করা ফতোয়াকে ভালো উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেছেন দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সমাজবিশ্লেষকরা। তবে তাদের মন্তব্য, একইসঙ্গে সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের দিকেও তাদের মনোযোগী হতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাঠ্যবইকে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আলেমদের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগকে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তারা বলেন, এই ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে তাণ্ডব চালানো হেফাজতে ইসলামের সেই মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীও আছেন জেনে তারা আশঙ্কা বোধ করছেন।
উল্লেখ্য, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন দেশের ১ লাখ ১ হাজার ৫২৪ জন মুফতি, ওলামা ও ঈমাম। বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার উদ্যোগে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী এবং মানবকল্যাণে শান্তির জন্য গৃহীত ফতোয়ায় সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করেছেন এসব মুফতি, ওলামা ও ঈমাম। ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানের খতিব ও এক লাখ আলেম, মুফতি ও ইমামের ফতোয়া ও দস্তখত সংগ্রহ কমিটির আহ্বায়ক ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ শনিবার সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ফতোয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন।
ফতোয়ায় 'অমুসলিম, সংখ্যালঘু ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ' উল্লেখ থাকার বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষ কথাটির অর্থ আসলে ভিন্ন। এর মাধ্যমে ধর্ম পালন করেন না বা নাস্তিক বা সংশয় ও অজ্ঞেয়বাদীদের উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এটি একটি বড় অগ্রগতি যে ধর্মীয় নেতারা এ ধরনের বৈচিত্র্যগুলোকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছেন।
এ ধরনের ফতোয়ার মধ্যদিয়ে জঙ্গিবিরোধী মানসিকতা তৈরি হওয়ার বা পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ কতটা তৈরি হবে জানতে চাইলে কলামিস্ট মাসুদা ভাট্টি বলেন, ‘পরিবর্তন কথায় আসে না। এটা ভেতর থেকে আসতে হয়। তবু এটাকে ভালো উদ্যোগ বলবো আমি। কিন্তু এ ফতোয়ার বিপক্ষের ওলামারা উল্টো কথা বলবেন। তাই সবার আগে তাদের এক হতে হবে। তবেই এধরনের উদ্যোগ সফলভাবে কার্যকরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরামের সদস্য ওমর শেহাব ফতোয়ার উদ্যোগে হেফাজতের উপস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, এই ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে তাণ্ডব করা হেফাজতে ইসলামের সেই মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীও আছেন। ঠিক যেমন প্রায় দুই দশক ধরে খন্দকার মুশতাক আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিলেন। এই লোক ঘাপটি মেরে না থেকে যান সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একটি বহুমাত্রিক লড়াই। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে যুদ্ধের অনেকগুলো দিকের মধ্যে একটি দিক সামলাবে। কাজেই এটি খুবই ভালো কাজ। এখন তার সঙ্গে অন্য মাত্রাগুলো নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। সবচেয়ে গভীর যে মাত্রা সেটি হল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। একটি বাচ্চার বাবা-মা না থাকতে পারে, অথবা বাবা-মা নিজেরাই একধর্মের শ্রেষ্ঠত্বভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী হতে পারেন। অথবা বাবা-মা ব্যস্ত থাকতে পারেন, অথবা বাবা-মা এসব ব্যাপারে সচেতন নাও হতে পারেন। কিন্তু যেরকম পরিবার থেকেই শিশুটি আসুক না কেন তাকে স্কুলের পাঠ্যবই পড়তেই হবে। কাজেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হল পাঠ্যবই।
ওমর শেহাব আরও বলেন, এর মানে কিন্তু এই নয় যে কেবল ইসলাম ধর্মের বইয়ের শেষের দিকে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কর্তব্য নামের কোনও একটি অধ্যায়ে কিছু সুন্দর সুন্দর কথা বলে দেওয়া। এটিতে খুব বেশি কিছু হবে না। এর জন্য বাচ্চাদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা যেকোনও কিছু নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। আমরা উচিত একটি বাচ্চাকে এমন সাহস দেওয়া যেন সে ক্লাসে পৃথিবীর যেকোনও বিষয়ে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করে। তাহলে এরপর কোনওদিন জঙ্গিদের রিক্রুটাররা যখন তাদের ধর্মবইয়ের পাতা দেখিয়ে বলবে এখানে বলা আছে তাই বইমেলায় বোমা মেরে আসো তখন সে তার প্রশ্ন করার অভ্যাসের কারণে এই আদেশটিকেও প্রশ্ন করবে এবং সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসবে। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছি না ততদিন পর্যন্ত কোন স্থায়ী সমাধান হবে না। সেই অস্ত্র কেবল ধর্ম বইয়ের শেষের দিকে মিষ্টি মিষ্টি কথা নয়, সেটি হবে ভীষণ কড়া ধরনের ক্রিটিক্যাল থিংকিং, যেমনটি বেগম রোকেয়া পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে করেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, এটাকে আমি ধর্ম দিয়ে ধর্মীয় ‘শয়তান’কে প্রতিরোধ হিসেবেই দেখছি। উদ্যোগটি খুবই ভালো। কিন্তু এটাই সব না। শেষমেষ সব লড়াই সাংস্কৃতিক লড়াই। সেখানে সরকারকে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ তৃণমূল পযন্ত শক্তিশালী থাকায় আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করেছি। এখন দেখা দরকার এই ফতোয়া তৃণমূলে কী ব্যাখ্যাসহ যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে যারা উগ্রবাদকে জায়গা করে দিয়েছিল তারা এখন সেখান থেকে সরে আসতে চাইছে। সার্বিকভাবে এই উদ্যোগকে আমি ভালো বলবো। কিন্তু এ দিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। সরকারকে তার পাঠ্যসূচি নিয়ে ভাবতে হবে। মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এখনও ফতোয়াটা আমি দেখিনি। দেখে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা সমীচীন হবে। তবে তিনি এও বলেন, আমাদের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত করার বিকল্প নেই।
/এফএস/টিএন/আপ-এনএস/
আরও পড়ুন:







