যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখতে নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। কিন্তু যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ওই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর থাকবে না।
২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গণভোটের মাধ্যমে পাকাপোক্ত হয়ে গেছে যুক্তরাজ্যের। এদিন ব্রিটিশ ভোটারদের ৫২ শতাংশ ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য, সহযোগিতা, আর্থিক লেনদেন, পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। এরইমধ্যে বৈশ্বিক অর্থবাজার বড় ধরনের ঝাঁকুনি খেয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনি দিয়েছে এ গণভোট। এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকরা কী করবেন তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ বিষয়ে নিয়ে আমার কোনও মন্তব্য নেই। এখন আমাদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।’
ইউরোপের ২৮টি দেশের দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো একই ধরনের সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার মেনে চলে। কিন্তু এখন জোট থেকে বের হয়ে গেলে যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ইইউয়ের কোনও সিদ্ধান্ত আর কার্যকর থাকবে না।
ওই কূটনীতিক বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যসহ ইইউয়ের অন্যান্য দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়ে থাকে বাংলাদেশ। জনগণের সিদ্ধান্তে যেহেতু যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তাই শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করতে হবে।’
বাংলাদেশ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে ২.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাজ্যের অবস্থান তৃতীয়।
তিনি বলেন, ‘গণভোটের পর যুক্তরাজ্যের মুদ্রা পাউন্ড দুর্বল হয়ে ১৯৮৫ সালের পর্যায়ে নেমে গেছে এবং এর প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে না পড়লেও নিকট ভবিষ্যতে পড়বে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকার কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব ইউরোর ওপর পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, লন্ডন হচ্ছে পৃথিবীর অর্থনৈতিক রাজধানী এবং পাউন্ডের মূল্য পরিবর্তন সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলে।’
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশির একটি বড় অংশ বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা ইইউ জোটে না থাকার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেছেন, ইইউ থেকে বের হয়ে গেলে বর্তমানের অভিবাসন নিয়ম শিথিল হবে এবং তারা বাংলাদেশ থেকে বেশি লোক নিতে পারবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কূনীতিক বলেন, ‘ভিসা নিয়ম পরিবর্তন হবে এমন সামান্য ঈঙ্গিতও কোনও জায়গা থেকে পাওয়া যায়নি।’
সম্প্রতি এক তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে প্রায় ১০ হাজার কারি রেস্টুরেন্ট আছে এবং প্রায় এক লাখ লোক সেখানে কাজ করে। প্রতিবছর এ খাতে ব্যবসার পরিমান প্রায় ৪.২ বিলিয়ন পাউন্ড।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শেষ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে এবং আমার মনে হয় তারা এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।’
পাউন্ড এবং ইউরো দুর্বল হলে বাংলাদেশের রফতানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রফতানিকারকরা এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।’
এ অর্থ বছরে রফতানিতে প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য নন-ট্র্যাডিশনাল বাজারের প্রবৃদ্ধির কারণে এবং ইউরোজোনে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি তেমন হয়নি।
ভিসা নীতি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা পরিবর্তন হওয়ার বিষয়ে কোনও সম্ভাবনা আমি দেখছি না।’
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা ইইউ থেকে বের হয়ে গেলেও বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর কোনও প্রভাব পড়বে না।’
এসএসজেড/এজে








