বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে রোগীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া সরকারি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে খোলা বাজারে। পাওয়া যাচ্ছে হাসপাতালগুলোর সামনের ফার্মেসি ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে। ওষুধের গায়ে সরকারি সম্পদ বিক্রি করা দণ্ডনীয় অপরাধ লেখা থাকলেও থেমে নেই সরকারি ওষুধ বিক্রি। এতে দেশের বেশিরভাগ দরিদ্র জনগণ যেমন সরকারি ওষুধ পাচ্ছে না, তেমনি স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে দেশের ওষুধ প্রশাসন কিছু না জানলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, এর জন্য দায়ী সরকারি হাসপাতালগুলোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে সবসময় মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা যায় না। একারণেই সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রির সুযোগ পায় কিছু অসৎ কর্মচারী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সরকারি ওষুধ পাচ্ছিলেন না রংপুরের সানোয়ারা খাতুন। স্যালাইন ও ব্যথার ওষুধ ছাড়া বাকি সব ওষুধই তাকে বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালেই যদি ওষুধ কিনে খাইতে হয়, তাইলে আমরা গরিব মাইনষেরা কেমনে বাচুম?’
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ওষুধ বিক্রি চললেও শেরে বাংলা নগর এলাকাতেই এই প্রবণতা বেশি বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে। কারণ, এই এলাকায় রয়েছে ৬টি সরকারি হাসপাতালসহ প্রচুর বেসরকারি ক্লিনিক। আর এই বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর ব্যবসার সঙ্গে হাসপাতালের কর্মকর্তা কর্মচারীরাও জড়িত থাকায় তারা হাসপাতাল থেকে সেখানে ওষুধ এনে বিক্রি করছেন দেদারসে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের একমাত্র সরকারি ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) ১৩৭ টি আইটেমের ওষুধ তৈরি করে। প্রতিবছর দেশের সরকারি হাসপাতালসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে চাহিদার প্রায় ৭২ শতাশ ওষুধ সরবরাহ করে ইডিসিএল। সরকার এখানে বিনিয়োগ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনসাধারণকে বিনামূল্যে সরবরাহ করার জন্য। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী হাসপাতালের সেই ওষুধ বিক্রি করে দিচ্ছে বাইরে। এতে বঞ্চিত হচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসার জন্য আসা দেশের দরিদ্র মানুষ।
সূত্র জানায়, গত ১৬ মে র্যাব-১ বাবুবাজারে সরকারি ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সংবাদ পেয়ে হাজি রানী মেডিসিন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার সরকারি ওষুধ এবং গত ২১ মে আলী মেডিসিন মার্কেট থেকেও প্রায় একই মূল্যের সরকারি ওষুধ, অনুমোদনহীন ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ উদ্ধার করে। সরকারি ওষুধ মজুদ ও বিক্রির অপরাধে সেবা মেডিক্যাল হলের মালিক সালাউদ্দিনকে ১ বছর, শিমন ড্রাগস হাউজের মালিক পারভেজ আলমকে দেড় বছর ও আন্নি মেডিক্যাল হলের মালিক মমিন উল্লাহকে ৯ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এদিকে, সরকারি ওষুধ বিক্রি এবং মজুদের অভিযোগে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৬১ টি অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৩৮টি মামলা করেন। এর মধ্যে ৪টি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে থানায়। বাকি ১৩৪টি মামলা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। এছাড়া অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যদের ২ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেন।
সরকারি ওষুধ বেচাকেনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নেতৃত্বদানকারী র্যাব-২-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি ওষুধ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যেখানে যে অবস্থায় যে গোডাউনেই হোক, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটাই বাধ্যতামূলক। বিক্রি নিষিদ্ধ ওষুধ যদি বিক্রিরত অবস্থায় পাওয়া যায়, বা বিক্রির উদ্দেশে মজুদ অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে তাকে বা তাদের বিরুদ্ধে শুধু র্যাব নয়, সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে, এ ক্ষেত্রে কোনও ছাড় পাবে না কেউ।
এদিকে, ওষুধ প্রশাসনের নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। সরকারি ওষুধ বাইরে যায় কি, যায় না এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না, কিছু জানি না।
সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. সামিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চেষ্টা থাকার পরও আমরা স্বাস্থ্যসেবার পুরোটা দিতে পারছি না এটা সত্যি। এর পেছনে আমাদের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অর্থনৈতিক দুবর্লতা, অবহেলা এবং অনৈতিকতাই দায়ী। আমরা অনেক সময়েই দেখি, সরকারি হাসপাতাল থেকে ওষুধ পাচারকালে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছেন, তারপরও সেটি বন্ধ হচ্ছে না। সরকারি ওষুধ দেশের সরকারি হাসপাতালে আসা মানুষদের জন্যই, তাদের আমরা সেগুলো দিতে পারলেই আমাদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হতো। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমাদের চেষ্টায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে, নৈতিক হলে দেশের মানুষ উপকৃত হবে।
তবে বাজেট কম থাকায় এবং অনেক ওষুধের উচ্চমূল্যের হওয়াতে অনেক ওষুধ হাসপাতালে সরবরাহ করা যায় না এটাও সত্যি বলেন সামিউল ইসলাম। আমরা চেষ্টা করছি, সম্পূর্ণ না হলেও যেন দেশের দরিদ্র মানুষ ওষুধ পায় সেটা নিশ্চিত করতে। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছি, কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না, হবেও না। তিনি বলেন, আর পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আমরা সবসময় মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করতে পারছি না। তবে দেশের আপামর জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু পদক্ষেপও হাতে নিয়েছে।
/এমএনএইচ/
আরও পড়ুন:
পাসপোর্ট খাত দুর্নীতির শীর্ষে: টিআইবি
রামপাল নিয়ে কেন হইচই তা আমার কাছে বোধগম্য নয়: প্রধানমন্ত্রী
মিতু হত্যাকাণ্ড: সোর্স মুছাসহ পলাতক পাঁচ আসামির দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা








