জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন চালাবে সরকার

এমরান হোসাইন শেখ
০৭ জুলাই ২০১৬, ০৪:৫৩আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৬, ০৫:২৬

জঙ্গি জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে এ আন্দোলন চালিয়ে যাবে ক্ষমতাসীন জোট সরকার। শিগগিরই এই কর্মসূচি শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
জানা গেছে, বিগত সময়ে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে সরকারের একটু ভিন্ন ধারণা থাকলেও গত ১ জুলাইয়ের গুলশান হামলা সরকারের সেই ধারণা বদলে গেছে। সরকার এতদিন জানত কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক কিছু সংগঠন এসব উগ্র-জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এর পেছন থেকে জামায়াত-শিবিরের বর্তমান বা সাবেক কিছু নেতার ইন্ধন রয়েছে। গুলশান হামলায় উচ্চবিত্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়ুয়া ছাত্রদের সম্পৃক্ততা সরকারের সেই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সরকারকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
এ কারণে সরকার সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে বাবা-মা, অভিভাবক ও তাদের তরুণ সন্তানদের সচেতন করতে সামাজিক আন্দোলনকেই অন্যতম অস্ত্র হিসেবে মনে করছে সরকার।  সরকারের নীতি নির্ধারকদের মতে, দেশের সর্বস্তরের জনগণের মাঝে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে এ ধরনের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বহুলাংশে দমন করা সম্ভব হবে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। গুলশান হামলার পর সরকারের পক্ষে সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় দেশের সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশের তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে বলেও তিনি এ সময় মন্তব্য করেন।

এর আগে গুলশান হামলার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিপথগামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি, কম্যুনিটি পুলিশ এবং সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সন্ত্রাস মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনার সন্তানকে সুশিক্ষা দিন। তারা যেন বিপথে না যায়, সেদিকে নজর রাখুন। বিপথগামীদের প্রতি আহ্বান, আপনারা সঠিক পথে ফিরে আসুন। ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখুন।

এদিকে, গুলশান হামলার পর এক অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, দেশের সব আঙুল ছিল কওমি মাদ্রাসার দিকে। কিন্তু শুধু কওমি মাদ্রাসাই নয়, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, এমনকী নর্থসাউথসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। তাদের ঠেকাতে অভিভাবক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সচেতন হতে হবে।

গত ৩ জুলাই এক সভায় ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটও প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ১২ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত দেশের সব ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলায় কবি-সাহিত্যিক–সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে জোট সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন করবে বলে জানিয়েছে।

সরকার ও দলের বাইরেও এই সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠছে। গুলশান হামলার পর এক অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও গুলশান সোসাইটির সভাপতি এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, ছোটোবেলায় বাবা-মা আমাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখেছেন। আমাদের সন্তানদের দেখাশুনার মধ্যে রাখতে হবে। দীর্ঘদিনের জন্য তারা কোথাও চলে গেলে কেন গেল, তারা কোথায় যায়—সে বিষয়গুলোতেও নজর রাখা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের নিজেদের উদ্যোগ নিতে হবে, আর সরকারকে সর্বোতভাবে সহায়তা করতে হবে।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, দেশের বিভিন্ন সময়ে সামাজিক অস্থিরতার বিষয়ে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেতৃত্বের অভাবে তা ফলপ্রসূ হয় না। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার এবার কেবল সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর গতিকে বেগবান করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।  

এদিকে, সামাজিক সচেতনার অংশ হিসেবে ঈদের জামাতের সময়ও মাঠ প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা ঈমামদের সঙ্গে সমন্বয় করে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদবিরোধী সচেতনামূলক পরামর্শের ব্যবস্থা করবেন। এ বিষয়ে শীর্ষ পর্যায় থেকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে দলের একাধিক নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন।

সামাজিক আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বুধবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা সামাজিক সচেতনামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। এর অংশ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রিভেনটিভ মেজেস হিসেবে সবাইকে সমন্বয় করে এগুলো আমরা চালিয়ে যাব। আমরা মনে করি, সবাইকে সচেতন করতে পারলে, এসব জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড  প্রতিহত করতে পারব।

ঈদের জামাতের সময়ও ঈমামদের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বক্তব্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা ১৪ দল থেকে বৈঠক করে ইতোমধ্যে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছি। পাড়া মহল্লায় সন্ত্রাসবাদ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঈদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এসব কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের অংশ হিসেবে সামাজিক সচেতনামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে মনিটরিং ও নেতৃত্ব দিয়ে এই সামাজিক আন্দোলনকে আরও বেগবান করা হবে বলেও তিনি জানান।

আরও পড়ুন:

জঙ্গি ভিডিও, ছবি ও বার্তা শেয়ার বা লাইক দিলে ব্যবস্থা

গুলশান হামলায় অর্ধশত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ, পুলিশ হেফাজতে ৫ জন

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম