উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী, প্রয়োজন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রোগ্রাম

জাকিয়া আহমেদ
১৩ জুলাই ২০১৬, ০৪:১১আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৬, ০৮:৪৫

বাজেট ২০১৬-১৭ প্রতিবছরই জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দের আয়তন বাড়ছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একটু একটু করে প্রতিবছর বরাদ্দ বাড়ছে। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের জন্য উন্নয়ন এবং অধিকারের জায়গা থেকে যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেখানে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ১ কোটি ৫০ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য  বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যার মাথাপিছু হিসাব ১ টাকা ৫৯ পয়সা করে, যেটিকে অপ্রতুলের চেয়েও কম বলা হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট দেওয়ার কথা বলা হলেও বাজেটে তাদের জন্য দেওয়া সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত এবং তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও এখানে উপেক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন তারা।

শুধুমাত্র  একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধীদের না রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিবন্ধীদের জন্য উন্নয়ন কাজ ভাগ করে দেওয়া দরকার বলেও মনে করেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবলমাত্র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য আরও বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন, সুরক্ষা এবং অধিকার নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে সেটার ওপর বাজেটে বরাদ্দ চান প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের মোট সংখ্যা কত সেটা নিয়েও নির্ভরযোগ্য কোনও পরিসংখ্যান নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা নয় দশমিক সাতভাগ প্রতিবন্ধী রয়েছে। সে হিসাবে ১৬ কোটি মানুষের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ। অপরদিকে, সমাজসেবা অধিদফতর বলছে, তিনবছর ধরে করা এক জরিপে পুরো দেশে তারা ১৪ লাখ ৮৫ হাজার প্রতিবন্ধী খুঁজে পেয়েছে। 

প্রতিবন্ধীদের জন্য যে বাজেট থাকা উচিত, সেই বাজেট একেবারেই নেই বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবেলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম ।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,প্রতিবন্ধীদের জন্য বাজেট এবার শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ভিত্তিক হয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয়,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোনও বাজেট নেই। প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি কেবল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এখানে অন্যান্য মন্ত্রণালয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।সবার সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আমরা চেয়েছিলাম, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট কিন্তু সেটা এত দিনেও হয়নি, আর হচ্ছেও না। বিষয়টি চলমান বাজেটে একেবারেই অনুপস্থিত। শুধুমাত্র সামাজিক নিরাপত্তার খাত ছাড়া আমরা কিছু দেখছি না, যেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে।

জহুরুল আলম বলেন,শুধুমাত্র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যে সমস্ত স্কুল রয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ করে অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল তাদের জন্য আর এই বাজেট বরাদ্দ মোট জাতীয় বরাদ্দের মাথাপিছু ১০০ টাকাও নয়।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, প্রতিবন্ধীদের জন্য যে বাজেট রয়েছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাজেটের আগে-পরে সংসদ সদস্যরাও এ নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু যে পর্যন্ত সরকারের অ্যালোকেশন অব বিজনেস না বদলাবে, মন্ত্রণালয় পরিচালনার এই বিধিমালা না বদলাবে এবং সেখানে প্রতিবন্ধীরা একীভূত না হবে, ততদিন পর্যন্ত প্রতিবন্ধীরা এভাবেই অবহেলিত থাকবে।মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেটের জন্য সমন্বিতভাবে বহুবার বলেছি,দাবি তুলেছি।

কিন্তু সরকার থেকে বরাবরই তারা একই কথা শুনতে পান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের যে অ্যালোকেশন অব বিজনেস বা রুলস অব বিজনেস যা দিয়ে মন্ত্রণালয় চলে, সেখানে বলা আছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধীদের দেখবে; যার জন্য অন্য কোনও মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কোনও বাজেট দেয় না। কিন্তু প্রতিবন্ধীদের যাতায়াত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এসব কিছু একা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়।কাজেই, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট ছাড়া প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন হবে না।

তিনি বলেন, কারও একার পক্ষে এ কাজ এগিয়ে নেওয়া কোনওদিনই হবে না। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন, তেমনি প্রতিবন্ধীরাও এর বাইরে নয়। প্রতিবন্ধী হলেও তারা মানুষ।

কাজেই তারা কেন অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সেবার বাইরে থাকবে প্রশ্ন রাখেন জহুরুল আলম। সমাজকল্যাণ শুধু যদি এখানে কাজ করে, তাহলে অন্য মন্ত্রণালয়গুলো বাদ পড়ে যাচ্ছে, যা উন্নত বিশ্বে হয় না। 

একই কথা বলেন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের পরিচালক ডা.নাফিসুর রহমান।

তিনি বলেন,প্রতিবন্ধীদের জন্য বাজেটে ফোকাল পয়েন্টে রয়েছে এমন বেশকিছু মন্ত্রণালয় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে একটি বৈঠক করি যেন তারা তাদের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধীদের রাখেন। কিন্তু এতকিছু করার পরও যতটুকু বাজেট বেড়েছে, তাতে আমরা মোটেও সন্তুষ্ট নই। কারণ,যতটুকু বাজেটে রাখা হয়েছে, সেগুলো সামাজিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষার জন্য।

বর্তমান সরকারের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবন্ধী মানুষদের দেখানো হয়েছিল ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ অংশ হিসেবে এবং সেখানে তাদের অধিকারের কথাও বলা হয়েছিল। তারা একটি আইনও করেছে যেখানে প্রতিবন্ধীদের অধিকারের কথাও বলা হয়েছে। গতবছর এর বিধিও করা হয়েছে। আইন এবং বিধি তৈরি হওয়ার পর আমাদের ন্যূনতম প্রত্যাশা ছিল বাজেটে সেই অধিকারের অন্তত এক/দুটি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বাজেট অ্যালোকেশন (বরাদ্দ) করা হবে।কিন্তু এখানে আমরা খুবই হতাশ।

কারণ হিসেবে ডা.নাফিসুর রহমান বলেন, বাজেটে অনেকগুলো প্রোগ্রামের কথা বলা হলেও সবই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুধুমাত্র অটিজম একাডেমি ছাড়া। এই একটি বিষয় ছাড়া আর কোনও মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনও প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, মহিলা অধিদফতরের ম্যানুয়ালে প্রতিবন্ধী নারীদের অগ্রাধিকারের কথা বলা হলেও সেখানে প্রতিবন্ধী নারী এবং শিশুদের নিয়ে কোনও প্রোগ্রাম নেই। প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারের কমিটমেন্টের কথা বলা হলেও কোথায় তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা হচ্ছে, প্রশ্ন রাখেন তিনি।

আবার একেবারে দরিদ্র নয় কিংবা শিক্ষিত যেসব প্রতিবন্ধী রয়েছেন, তাদের উন্নয়নে সরকারের কোনও প্রণোদনা নেই বলেও উল্লেখ করেন ডা.নাফিসুর রহমান।

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সমন্বয় এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটি নামে দুটি কমিটি ছাড়াও প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং শহর কমিটি রয়েছে জানিয়ে নাফিসুর রহমান বলেন, আইনে বলা হয়েছে, এই কমিটিগুলো নির্দিষ্ট দুই বা তিনমাস অন্তর মিটিং করবে।অথচ এসবেরও জন্যও কোনও বাজেট নেই। একটা থোক বরাদ্দ হলেও কিছু থাকতে হবে। সেটাও নেই। তাহলে আইন বাস্তবায়ন কী করে হবে, প্রশ্ন রাখেন নাফিসুর রহমান।

/এবি/আপ-এনএস/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম