নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম হিসেবে ওসিসি (ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, অ্যাসিড সন্ত্রাসসহ যে কোনও নির্যাতনের ফলে কোনও নারী বা শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরকে বিশেষ সেবা সহযোগিতা দিয়ে থাকে ওসিসি। প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিনামূল্যে খাবার এবং চিকিৎসার পাশাপাশি আইনি সহায়তাও দেওয়া হয় ওসিসি থেকে। এখানে রয়েছে মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ওসিসিকে (ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে তিনদিন ওসিসিতে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলতে অনেকেই এখানে এসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সেবা নিতে চান।
সোমবার ওসিসিতে গিয়ে দেখা যায়, সবুজবাগের সিপাহীবাগ থেকে মা এবং দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে ওসিসিতে এসেছেন এক নারী। তিনি জানান, গত শুক্রবারে বাবার সঙ্গে দাদাবাড়িতে যায় তার আড়াই বছর বয়সী শিশু কন্যা। তবে বাড়ি ফিরে আসার পরই সে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, তার সন্তান ঠিকমতো খায় না, কথা বলে না। তবে এক ঘণ্টা সেখানে থেকে শিশুটির মধ্যে এ ধরনের কিছু দেখা যায়নি। সে চিপস খাচ্ছিল, পুরো ওসিসি দৌঁড়ে বেড়াচ্ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, জেরায় মা তেমন কিছু বলতে পারেননি। মূলত স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার পরিকল্পনা করাতেই হয়তো তিনি নিজের মেয়েকে ভিকটিম বানিয়েছেন। অনেক বছর ধরে এখানে কাজ করছি। আমরা বুঝতে পারি কোনটা আসল, আর কোনটা নকল। এই মহিলা স্বামীকে ফাঁসাতে এসেছেন। স্বামীর বিয়ে করার কথা শুনে হয়তো উকিলের কাছে গেছেন। উকিল বলেছেন, রেপ কেস দাও, এজন্য এখানে এসেছেন, বলেন জানান তিনি।
কর্মকর্তাটি আরও বলেন, এমন মিথ্যা ঘটনা আমরা প্রায়ই পেয়ে থাকি। টাকা দিয়ে রেপ করেছে, এমনও অনেক ঘটনা পাই। কিন্তু পরে তদন্তে সেগুলো বের হয়ে আসে। গ্রেফতারও করা হয়েছে এদের। এটাই ওসিসির অর্জন বলে জানান তিনি।
তার দাবি, ওসিসিতে এসে কেউ এধরনের প্রতারণা করে পার পেয়ে যেতে পারেনি।
জমিজমা সংক্রান্ত জটিলতায় টাকা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অভিযোগ করেন অনেকে। এমন ঘটনা ঘটেছে নিজের শরীরে নিজে চামচ দিয়ে, নখ দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত হয়ে এখানে এসেছেন। পরে আমাদের জেরার মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে লোক তাকে নিয়ে এসেছেন তিনিই দুই হাজার টাকা দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য।
তিনি বলেন, যারা প্রকৃত নারী নির্যাতনের শিকার হন, এসব মিথ্যা ঘটনার জন্য তারাও বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এরকম মিথ্যা মামলা আমরাও পেয়ে থাকি। এরকম ঘটনা পেলে আমরা উদ্যোগী হই। আসল ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হয়। কারণ, আমরা মনে করি অপরাধীর যেমন শাস্তি হতে হবে, তেমনি কোনও নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়। কোনও ঘটনা নিয়ে আমাদের সন্দেহ হলে তখন আমরা তদন্ত করি। কোর্টকে বলি, কেনও আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। আমরা তখন সাক্ষী যোগাড় করি। আদালত তার নিয়ম অনুযায়ী চলেন।
ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিথ্যা কিংবা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কোনও মামলা হয় কিনা সেটা আমরা বলতে পারবো না। খুব জটিল বিষয় এটি। আমরা অভিযোগটাকে অভিযোগ হিসেবেই নিতে চাই। অভিযোগ করার পর যখন পুলিশ তদন্ত করে কিংবা বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয় তখন বোঝা যায় অভিযোগ সত্য নাকি মিথ্যা। আমার অবস্থান থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করা খুব কঠিন।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০০১ সালে প্রথম চালু হয় ওসিসির কার্যক্রম। পরবর্তীতে বিভাগীয় শহরসহ আটটি ওসিসি সেন্টার ও জেলা পর্যায়ে ৪০টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ২০টি ওসিসি সেলের মাধ্যমে নির্যাতিত নারী-শিশুদের ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক পুন:একত্রীকরণ, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিংসহ নির্যাতিত নারীদের সহযোগিতা করে থাকে ওসিসি।
অারও পড়তে পারেন: লঞ্চের কেবিনে কিশোরীকে গলা কেটে হত্যা
/এনএস/এমএসএম/








