সুন্দরবন ঘেঁষা রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি বলে দাবি করেছেন পরিবেশবাদী ও অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য লাভজনক নয়। মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারতীয় ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) ওই কোম্পানি থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের পরিবেশ ও জনপদ নষ্ট করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যের কাছ থেকে আমাদের কিনতে হবে!
গত ১২ জুলাই বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট বাস্তবায়নে মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই প্রকল্প বিষয়ে সরকারপক্ষ দৃঢ়তা দেখালেও এর পক্ষে যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারছে না বলে দাবি তেলগ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর খনিজসম্পদ রক্ষায় জাতীয় কমিটি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন যে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, সে বিষয়ে একদল বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী ও সামাজিক আন্দোলনকারীরা যেমন নিশ্চিত সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ক্ষতি না হওয়ার কথাও বারবার বলা হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এবং প্রকল্পের ভারতীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষতির বিষয়গুলো জানিয়ে প্রকল্পটি বন্ধের আহ্বানও জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পের নাম বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লি.। এর সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং এনটিপিসি লি. ইন্ডিয়া। প্রকল্প ব্যয় (এফ আর) ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার (১৪,৫১০ কোটি টাকা) অর্থ যোগান: ঋণ: ৭০ শতাংশ (ইসিএ লোন), ইকুইটি: ৩০ শতাংশ (বিপিডিবি ১৫ শতাংশ ও এনটিপিসি ১৫ শতাংশ ) - এই প্রজেক্ট একটি কোম্পানি আইনে চলবে। এই কোম্পানির মালিকানা বিপিডিবি ৫০ শতাংশ ও এনটিপিসি ৫০ শতাংশ)। যার অর্থ দাড়ায় এই কোম্পানির লাভ দুটি প্রতিষ্ঠানই সমান ভাগে পাবে।
তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এ ফ্লাইঅ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূত ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে। কারণ এতে আর্সেনিক ও বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন—পারদ, সিসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, বেরিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। ফলে সুন্দরবনের পশুপাখি-বৃক্ষ-লতাপাতাসহ অসংখ্য প্রাণ ও ইকোসিস্টেম ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।
তাদের যুক্তি, এনটিপিসি যদি এই প্রকল্প ভারতের অংশের সুন্দরবনের আশপাশে করতে চাইতো তবে অনুমতি পেতো না, ভারতীয় আইন মতে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন নেই। তবে এনটিপিসি কেন বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে আগ্রহী সেটাও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
উল্লেখ্য, ভারতের মধ্যপ্রদেশে এই এনটিপিসি আরেকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন পায়নি।
এদিকে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা আছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ হয়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে তার চেয়ে ৬২ শতাংশ বেশি খরচ হবে। রামপাল প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ করেছে, যার আর্থিক মূল্য ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। বিদ্যুৎ প্রকল্পটিতে কয়লা আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হবে।
এতকিছুর পরও কেন এটা করতেই হচ্ছে প্রশ্নে তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর খনিজ সম্পদ রক্ষায় জাতীয় কমিটির সমন্বয়ক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশি শাসকগোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য সরকার এগুলো করছে। ভারতকে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, চীনকে দেওয়া হচ্ছে বাঁশখালী ধ্বংস করে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। তিনি বলেন, যে দেশের মানুষের সুন্দরবন রক্ষার মতো সংবেদনশীলতা বা দায়িত্ববোধ তৈরি হয় না, সে দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং সহিংসতা থেকে মুক্ত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। এই প্রকল্পের প্রকৃত খরচ গোপন করা হয়েছে। প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেই জানানো হয়েছে প্রকল্পটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। আমরা যেটুকু পযবেক্ষণ করেছি, তাতে এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে দেশের জন্য কোনও সুফল আসবে না।
এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সচিব মনোয়ার ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
/এমএনএইচ/আপ-এনএস/








