মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলী ফাঁসির আগ মুহূর্তে এবং জঙ্গিরা সাম্প্রতিক সময়ে যে কথাবার্তা বলেছে, তার সুর একই। গুলশান হলি আর্টিজানে হামলার শেষ মুহূর্তে জিম্মিদের ছেড়ে দেওয়ার সময় জঙ্গি নিবরাস ইসলাম বলেছিল, ‘তোমরা চলে যাও, আমরা একটু পরে জান্নাতে যাব।’ ঠিক একইভাবে মীর কাসেম আলী শনিবার পরিবারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে স্ত্রীকে বলেন, ‘আমি জান্নাতে যাচ্ছি। তোমরা প্রস্তুত থেকো। আমি জান্নাতে গিয়ে তোমাদের জান্নাতে নেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’
কাসেম আলী এবং নিবরাসদের বার্তার এই সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্লেষকরা বলেন, এদের আদর্শিক জায়গা একই। এরা চায় বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে। এরা চায় ইসলামের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। তারা মনে করে, এভাবে ‘জান্নাত’ নিশ্চিত করা যায়।
ইসলামী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অপরাধী তাদের অপরাধের বৈধতা দিতে গিয়ে ধর্মের প্রলেপ লাগায় এবং জান্নাতে যাচ্ছে বলে নিজেকে মহিমান্বিত করতে চায়। এই ভুল মনোভাবের কারণেই তাদের পক্ষে নৃসংশ হওয়া সম্ভব হয়। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, এদের উদ্দেশ্য এক বলেই পরস্পরের সঙ্গে তাদের সখ্যতা।
গুলশানে নিহত জঙ্গিদের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যারা এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে, তাদের মগজ এমনভাবে ধোলাই করা হয় যে, কোনও যুক্তিতেই তারা হত্যা বন্ধ করবে না। গুলশানে যে জঙ্গিরা ছিল, তারা আর্টিজানের দেয়ালে লিখে গেছে, 'উই আর গোয়িং টু জান্নাত'। কী ধরনের মগজধোলাই হলে এ ধরনের কাজ করা যায়!”
মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের দিন সকালে তার মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আব্বু, আমাদের ভাইবোনের জন্য আল্লাহর কাছে জান্নাতের সুপারিশ করবানা? আব্বু একগাল হেসে বললেন, শুধু তোমরা না, আমার নাতি-নাতনী, বউমা, জামাই সবার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করব।’
ইসলামী বিশ্লেষক ফরিদ উদ্দিন মাসউদ মনে করেন, ‘জান্নাতে যাওয়ার বিষয়ে এ ধরনের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। অপরাধের বৈধতা দিতে লাগানো হয় ধর্মের প্রলেপ।’
শোলাকিয়া ঈদগাহের এই খতিব মনে করেন, ‘এই অপরাধীরা মৃত্যু অবধারিত জেনে সেটাকে মহিমান্বিত রূপ দিতে জান্নাতে যাওয়ার কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়।’ তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরা মন্দকে ভালো আর ভালোকে মন্দ মনে করে জীবনভর মন্দ কাজটাই করে। অপরাধবোধে আক্রান্ত হলে অপরাধীরা সেখান থেকে মুক্তি চায়। আবার বৈধতা দিতে গিয়ে ধর্মের প্রলেপ লাগায়। সর্বশেষ জনগণকে প্রতারিত করতে চায় জান্নাতে যাওয়ার কথা বলে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জান্নাত কিংবা জাহান্নাম তো আল্লাহ মানুষের কৃতকর্ম দেখে ঠিক করবেন। এ ধরনের কথা বলে তারা বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দেয়।’
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের যে আদর্শ, তা এগিয়ে নিয়ে গেছে জামায়াত। অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের হাত ধরে বেড়ে উঠেছে। এদের আদর্শের জায়গায় খুব বেশি এদিক-ওদিক দেখা যায় না। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ছড়াতে যারা চেয়েছে, তারা আকাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে না পেরে রূপ আর কৌশল বদলেছে, এটা নিশ্চিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘একদল বলছে ইসলামী শাসনতন্ত্র, কেউ বলছে ইসলামী খেলাফত। কিন্তু শিকড়টা আমাদের দেশে একটাই।’
জঙ্গিরা তুলনামূলক বেশি উগ্রতা নিয়ে হাজির হয় উল্লেখ করে আবদুর রশীদ বলেন, “এরা ইসলামী খেলাফতের নামে আইএসের ছত্রছায়ায় আসতে চায়। মীর কাসেমের স্ত্রী বলেন, তিনি ‘ইসলামের কারণে’ মারা গেলেন। সেটাতো ইসলামের কারণ না, মানবতাবিরোধী অপরাধ করায় ফাঁসি হয়েছে। নিবরাসের ক্ষেত্রেও ওই একই কথা।”
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই যুদ্ধাপরাধীরা একাত্তরের পর লুকিয়ে গেলেও ৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর যখন পুনর্বাসিত হলো, তখন থেকে তারা সুপরিকল্পিত কৌশলে তাদের আদর্শকে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছে। এরা ভিন্ন কেউ নয়। আমরা বারবারই বলেছি, সংগঠন হিসেবে জামায়াত যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তাতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, তারাই এ জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ফলে এদের কথার সুর যে এক থাকবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে প্রসার ও বিস্তার হয়েছে, তার ক্ষেত্রটা প্রস্তুত তো এই যুদ্ধাপরাধীরাই করে দিয়েছে।’
/ইউআই/এআরএল/টিএন/
আরও পড়ুন: মীর কাসেমের দাফন সম্পন্ন







