ঠাঁই নেই লাশ কাটা ঘরে

জাকিয়া আহমেদ ও আমিনুল ইসলাম বাবু
০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৫:৫৩আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৮:০৯

ঢামেক মর্গ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে একসঙ্গে রাখা যায় ২০টি মরদেহ। কিন্তু গত দেড় মাসে নিহত ১৩ জঙ্গির মরদেহ হস্তান্তর না হওয়ায় ও সেইসঙ্গে মর্গের ফ্রিজ নষ্ট থাকায় ঢামেক মর্গে মরদেহ রাখতে হচ্ছে গাদাগাদি করে। ফ্রিজের কোনও কোনও চেম্বারে একাধিক মরদেহ রাখতে হয়েছে এ জন্য। আর এতে করে মরদেহের আলামত নষ্ট হচ্ছে বলে মর্গ সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, মাসখানেক ধরে দেশের সবচেয়ে বড় এই হাসপাতালের মর্গ চলছে নানাবিধ সমস্যার মধ্য দিয়ে। কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েও বিষয়টির কোনও সুরাহা হয়নি। ফলে, মর্গে মরদেহ সংরক্ষণ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে ২০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরনো দুটি ও নতুন পাঁচটি ফ্রিজের দুটিসহ মোট চারটা ফ্রিজ নষ্ট। এ কারণে মর্গে বর্তমানে ১২টি মরদেহ রাখা যায়। কিন্তু জুলাই মাস থেকে চলতি মাস পর্যন্ত চারটি জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করার পর মর্গে এখন মরদেহ রাখার সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মর্গে ১৬টি মরদেহ সংরক্ষিত রয়েছে। কোনও কোনও ফ্রিজের ড্রয়ারে একাধিক মরদেহ রাখা হয়েছে স্থান সংকুলান না হওয়ায়।

‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানালেও কোনও সুরাহা পায়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে, নতুন মরদেহ এলে সেগুলো নির্ধারিত ফ্রিজে রাখা যাচ্ছে না। বাইরে রাখতে হচ্ছে। আর বাইরে রাখায় অনেক মরদেহের ‘কজ অব ডেথ’ নির্ণয় করাও ময়নাতদন্তে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢামেক ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নয় জঙ্গি নিহত হয়। তাদের মরদেহসহ ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় আরও তিন জঙ্গির মরদেহও রাখা হয়েছে ঢামেক মর্গে। সর্বশেষ, ২ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রূপনগরে নিহত এক জঙ্গির মরদেহ রাখা হয়েছে এই মর্গে। আর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় সাত মাস আগে মারা যাওয়া এক ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ রাখা হয়েছে ঢামেক মর্গে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার আরেক নাগরিকের মরদেহও আদালতের নির্দেশে রাখা হয়েছে এখানে। এছাড়াও আরও একটিসহ মোট ১৬টি মরদেহ সংরক্ষণ করতে হচ্ছে মর্গে। ফলে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোনও কোনও ফ্রিজের ড্রয়ারে রাখতে হয়েছে একাধিক মরদেহ। এদিকে, প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫ থেকে ৭টি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আসে ঢামেক মর্গে। সেগুলোও প্রয়োজনে রাখতে হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ঠাঁই নাই নতুন মরদেহ সংরক্ষণ করার।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা.সোহেল মাহমুদ জানান, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। এখন নতুন মরদেহ এলে সেগুলো নির্ধারিত ফ্রিজে না রেখে বাইরে রাখতে হচ্ছে। আর বাইরে রাখায় অনেক লাশের ‘কজ অব ডেথ’ (মৃত্যুর কারণ নির্ণয়) নির্ণয় করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।’

সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মরদেহ ঠিকমতো ফ্রিজিং করতে না পারলে তার আলামত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা আমাদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।’

মর্গ সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চক্রবর্তী বিভাগের পক্ষ থেকে সম্প্রতি কলেজ অধ্যক্ষকে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা ছিল, ‘গত ২৬ জুলাই নিহত জঙ্গিদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ মর্গে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু বিগত কয়েকদিন ধরে মরচুয়ারিকুলার নষ্ট হওয়ায় মৃতদেহ সংরক্ষণ করা এবং প্রতিদিন মর্গে আসা মৃতদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় মৃতদেহগুলো হস্তান্তর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থ্যা গ্রহণ করতে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’

এ বিষয়ে মর্গের সহকারী সেকান্দার আলী জানিয়েছেন, মর্গের ফ্রিজে কয়েকজন বিদেশির মরদেহসহ কল্যাণপুরে নিহত নয় জঙ্গির মরদেহ কোনোমতে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়েছে। এর ওপর নারায়ণগঞ্জ থেকে আনা নিহত তিন জঙ্গির মরদেহ কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। পরে ফরেনসিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ফ্রিজ থেকে কয়েকটি মরদেহ ময়নাতদন্ত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। আর নারায়ণগঞ্জ থেকে আনা নিহত তিন জঙ্গির মরদেহ রাতের জন্য ফ্রিজে রাখা হয়। অপরদিকে, যে কক্ষে ময়নাতদন্ত করা হয় এবং এর সংলগ্ন যে কক্ষে চিকিৎকরা বিশ্রাম নেন সে কক্ষগুলোর তিনটি এয়ারকন্ডিশনার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই নষ্ট হয়ে আছে।

ডা. সোহেল মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবেই গড়ে চার থেকে পাঁচটি মরদেহ আসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। প্রতিদিন সাত থেকে আটটি ময়নাতদন্ত হয় এখানে। তাহলে এই মরদেহগুলো কোথায় রাখা হবে প্রশ্ন করে সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘গরমকালে মরদেহ বাইরে রাখলে এমনিতেই সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ফুলেফেঁপে ওঠা মরদেহে আলামত খুঁজে পাওয়া তখন খুব কঠিন হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘সরকার যদি এ মরদেহগুলো নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতো, যদি এখান থেকে এগুলো হস্তান্তর করা যেতো, তাহলে আমাদের ফ্রিজগুলো খালি হতো। তাহলেই কেবল রুটিনমাফিক যে ময়নাতদন্তগুলো হয়, সেগুলো এখানে সংরক্ষণ করা যেতো।’ এতে করে তাদের কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারেন বলেন জানান ডা. সোহেল মাহমুদ।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ অধ্যক্ষ মো. ইসমাইল খান রবিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রথমে রমনা থানার ওসি এবং পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনও কোনও জবাব পাইনি।’

তবে সোমবার এ চিঠির জবাব দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তারা  জানিয়েছে, জঙ্গিদের লাশের ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এসব লাশ কী করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ততদিন এসব জঙ্গির মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থাকবে।

ডিএমপির উপকমিশনার মাসুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘সম্প্রতি পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ১৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুলশানের জঙ্গিদের ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলেও কল্যাণপুরে নিহত ৯ জঙ্গির ডিএনএ প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি।’

/জেএ/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম