বাংলাদেশের বিভিন্ন গারমেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে তৈরি পোশাকগুলো বেরিয়েছে সবেমাত্র গত সপ্তাহে। আর এদিন মঙ্গলবারেই তা দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত ডিএলএফ প্লেস মলে শোভা পাচ্ছে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের শোরুমে। ভর দুপুরেও ক্রেতারা ভিড় করে কিনছেন ফ্যাশনদুরস্ত সেই সব ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পোশাক, যেগুলো টাঙানো আছে বিপণির ‘নিউ অ্যারাইভাল’ সেকশনে।

কয়েকদিন আগেও এ দৃশ্য কল্পনা করা যেত না, কিন্তু গত বছর স্বাক্ষরিত হওয়া ‘বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপাল’ বা বিবিআইএন মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্টের সুবাদে এটা এখন বাস্তব। বাংলাদেশ থেকে ট্রাকে চেপে তৈরি-পোশাকের সেই কনসাইনমেন্ট সীমান্ত পেরিয়ে সোজা এসে হাজির হয়েছে দিল্লিতে, বর্ডারে কাস্টমস বা মাল ওঠা-নামা করার কোনও ঝক্কিই পোহাতে হয়নি সেই ট্রাককে।
‘প্রতি মাসেই আমরা বাংলাদেশ থেকে প্রায় কুড়ি ট্রাক রেডিমেড গার্মেন্টস আনিয়ে থাকি ভারতে আমাদের শোরুম-গুলোর জন্য। কিন্তু তাতে ঝক্কি-ঝামেলা লেগেই থাকত। এখন যদি এতো সহজে সীমান্ত পেরিয়ে মাল আনা-নেওয়া করা যায় তাহলে সেটা আমাদের কাছে বিরাট সুবিধা—কারণ তাতে খরচও কমবে, বাজারের লেটেস্ট ফ্যাশনটাও অনেক দ্রুত আমরা ক্রেতার হাতে পৌঁছে দিতে পারবো। বাংলাদেশ থেকে এখন আমাদের আমদানি যে অনেক বাড়বে তাতে কোনও সন্দেহই নেই!’, বাংলা ট্রিবিউনকে এদিন বলছিলেন ভারতে মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সারের কান্ট্রি হেড নিধি দুয়া।
নিধি দুয়া এতটা খুশি, কারণ ঢাকা থেকে সাত-আটদিন আগে পাঠানো তাদের এক বিশাল কনসাইনমেন্ট গতকাল দিল্লিতে পৌঁছে পটপড়গঞ্জের কাস্টমস ডিপোতে মাল খালাস করেছে। মাঝখানে কলকাতায় কিছু আনুষ্ঠানিকতা ছিল, ২ সেপ্টেম্বর ভারতে শ্রমিক ধর্মঘটের জন্যও বেশ কিছু সময় নষ্ট হয়েছে। নইলে আরও আগেই দিল্লি পৌঁছে যেত সেই ট্রাক।
আসলে সীমান্তে যে কোনও পণ্য পারাপারে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে কাস্টমসের ছাড়পত্র পেতে। তারপর এক দেশের লরি-র যেহেতু অন্য দেশে যাওয়ার এতদিন কোনও অনুমতি ছিল না, তাই বাংলাদেশের ট্রাক থেকে মাল নামিয়ে তা তুলতে হত ভারতের অন্য একটি ট্রাকে। তারপর চেকপোস্টে ধর্মঘট হলে তো কথাই নেই, মাল পড়ে থাকত দিনের পর দিন।
নতুন ব্যবস্থায় ভারত, বাংলাদেশ, ভূটান বা নেপালের ট্রাক সটান এক দেশ থেকে অন্যত্র পাড়ি দিতে পারবে অনায়াসে। আর গতকাল সোমবারে যে ট্রাক ঢাকা থেকে দিল্লি এসে পৌঁছেছে, সীমান্তে তাকে কোনও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স করাতে হয়নি। তার বদলে পেট্রাপোল সীমান্তে ভারতের শুল্ক বিভাগের কর্তারা ইলেকট্রনিক্যালি সেটি সিল করে দিয়েছিলেন–আর ওই ট্রাকে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস। এই পাইলট রানের জন্য ট্রাকটিকে দেওয়া হয়েছিল একটি ই-পারমিট।
বিশ্ব ব্যাঙ্কের হিসেব বলছে, বিবিআইএন চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য চলাচল অন্তত ষাট শতাংশ বাড়তে পারে। দিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরআইএস-এর রিজিওনাল কানেক্টিভিটি বিশেষজ্ঞ ড. প্রবীর দে মনে করেন,‘বৃদ্ধির অঙ্কটা আরও বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, ‘ফুড প্রোসেসিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাণ শিল্পগোষ্ঠী পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই পয়লা সারির একটি কোম্পানি। তারা অরেঞ্জ জুস তৈরি করার জন্য কমলালেবু আনায় ভুটান থেকে, কিন্তু ভুটান থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে সেই লেবু আনাটা এতদিন ছিল ভীষণ ঝামেলার। লেবু খুব তাড়াতাড়ি নষ্টও হয়ে যায়। এখন বিবিআইএন চুক্তির আওতায় ভুটানের কমলালেবু ভর্তি ট্রাক সরাসরি বাংলাদেশে তাদের প্ল্যান্টে গিয়ে চালান খালাস করতে পারবে, এতে প্রাণের ব্যবসার পরিমাণও অবধারিতভাবে বাড়বে’।
ভারতের চিফ কমিশনার অব কাস্টমস বিবেক জোহরিও মনে করছেন সীমান্তে তাদের কাস্টমস পোস্টগুলোই ছিল এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা। তিনি বলেন,‘আমার বলতে দ্বিধা নেই বহুদিন ধরে ব্যবসায়ীদের কাছে এটা ছিল বিরাট এক যন্ত্রণা, কিন্তু বিবিআইএন এখন সেটা থেকে মুক্তি দেবে’।
ঢাকার তেজগাঁও ট্রাক ডিপোতে নজরুল ট্রাক এজেন্সি-র যে লরিটি গতকাল দিল্লিতে এসে মাল খালাস করে একইদিনে আবার মাল নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়েছে সেটিও এখন এক অর্থে ইতিহাসের অংশ। ওই ট্রাকের দুই চালক মতিউল ইসলাম ও মোহাম্মদ রাসেল কেউই ভাল হিন্দি বোঝেন না, কিন্তু সোমবার দিল্লিতে মাল খালাসের অনুষ্ঠানে তাদের নিয়েও মাতামাতি কম হয়নি।
নানা প্রশ্নের মুখে তারা শুধু হাসিমুখে একটা কথাই বারবার বলছিলেন, “ইন্ডিয়া কা রোড বহুত আচ্ছা!”








