রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে কেনাবেচা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যাপারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে জাল টাকার আতঙ্ক। পশুবিক্রির টাকা সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করলেও জাল টাকা নিয়ে তাদের মনে সন্দেহ থাকছেই। তাই অনেককেই দেখা গেছে, হাটে স্থাপিত জাল টাকা শনাক্তের বুথে এসে টাকা লেনদেন করতে। হাটের ইজারাদার কর্তৃপক্ষও মাইকিং করে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে এ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার বিকালে গাবতলীর পশুর হাটে বেশ কয়েকজন ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাল টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। জাল টাকা নিয়ে প্রতারিত হয়ে পুঁজি হারানোর আশঙ্কা করছেন তারা।
যশোর থেকে গত ৭ সেপ্টেম্বর গাবতলীর হাটে এসেছেন শাহ আলম বেপারী। তিনি ১৮ টি গরু নিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে শাজাহান, দ্বীন-আলী, আমজাদ হোসেনও গরু নিয়ে গাবতলীর হাটে এসেছেন। প্রতিবছর তারা কোরবানির হাটে গাবতলী আসেন।
শাহ আলম বেপারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি দুই বছর আগে একবার ধরা খাইছি। একলোক একটা গরু কিনে নিয়ে গেছে, বেশি ধরাধরি করেনি। ৫২ হাজার টাকায় একটা গরু বিক্রি করেছিলাম। একটা বান্ডিলে। ওর মধ্যে ৯ হাজার টাকা আসল ছিল। বাকি সব জাল। আমি ধরতে পারিনি। পরে বাড়িতে গিয়ে ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময় জানছি। এবার খুব সাবধান আছি। টাকা একটা একটা করে বেছে বেছে নিবো।’
তার সঙ্গে কথা শেষ করে কথা হয় গাবতলীর প্রধান সড়কের সঙ্গেই তিনটি গরু নিয়ে একটি তাবুর নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাপারী সুরত আলীর সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বুথে গিয়ে লেনদেন করব। আগে থেকেই শুনে আসছি, পশুর হাটে খারাপ মানুষরা জাল টাকা নিয়ে আসে। আমরা সতর্ক আছি।’
এদিকে গত এক সপ্তাহেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে জাল নোট তৈরির কয়েকটি চক্রকে জাল টাকাসহ আটক করেছে র্যাব ও পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে ১০-১২টি জাল টাকা তৈরির চক্র রয়েছে। ঢাকার বাইরেও তাদের সদস্য রয়েছে। সাধারণত চক্রের প্রধানরা ঢাকাতেই জাল নোট তৈরি করে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়। প্রতিটি চক্রের সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে ১০ জন। সম্প্রতি কয়েকটি চক্রকে জাল নোটসহ গ্রেফতারও করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর চক্রের সদস্যরা জাল নোট তৈরি ও বাজারে ছড়িয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন তথ্য দিয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের কাছে।
বুধবার রামপুরা থানাধীন দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় জাল টাকা তৈরির একটি কারখানা পায় র্যাব। এসময় জাল টাকা ব্যবসায়ী চক্রের ৫ সদস্য আটক ও বিপুল পরিমাণে জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে এই চক্র ইতিমধ্যে কোটি টাকার বেশি জাল নোট বাজারজাত করেছে। আরও ২ কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ডিবি পুলিশ জাল নোট তৈরি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ জানিয়েছে, জালনোট বাজারে ছাড়া হয় কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে। প্রথমে এগুলো যারা তৈরি করে তারা এক লাখ জালনোট ১৫-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। এরপর এগুলো যারা কেনে তারা ২০ থেকে ২৫ হাজার দামে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে। এরপরেই এগুলো বাজারে ছাড়ে তৃতীয় পক্ষ। এক্ষেত্রে তারা আসল নোটের মূল্যমানেই নকল নোটগুলো দিয়ে পণ্য কেনে।
কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে জাল টাকা প্রস্তুতকারী গ্রুপের কয়েক সদস্যকে গ্রেফতার করেছি। বাকিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এছাড়াও হাটগুলোতে আমাদের কড়া নজদারি রয়েছে যাতে এই চক্র জাল টাকা ছড়িয়ে দিতে না পারে।’
এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন গবাদিপশুর হাটে জালনোট শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করে জালনোট শনাক্তকারী মেশিনের সহায়তায় অভিজ্ঞ ক্যাশ কর্মকর্তাদের দিয়ে হাট শুরুর দিন থেকে ঈদের পূর্বরাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে পশু ব্যবসায়ীদের বিনা খরচে নোট যাচাই সংক্রান্ত সেবা দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বুথে নোট যাচাইকালে কোনও জালনোট ধরা পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিপত্র নং- জালনোট: ১(পলিসি)/২০০৭-১৯১ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ঢাকার বাইরে যে সব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস রয়েছে, সেখানেও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অনুমোদিত পশুর হাটগুলোতে স্থানীয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয় বা প্রধান শাখাগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে ২২টি হাটের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এসব হাটে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের বুথ বসানো হয়েছে। বিনামূলে এসব বুথ থেকে সহযোগিতা করবে ব্যাংকের কর্মীরা।
/এআরআর/টিএন/








