
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আক্তার জাহান জলির আত্মহত্যার ঘটনায় তার ফেলে আসা সংসারের হতাশা ও সেখানকার তিক্ত অভিজ্ঞতাকে এড়াতে যেতে না পারাকে চিহ্নিত করছেন তার সহকর্মীরা। তারা বলছেন, চাপা স্বভাবের এই শিক্ষক পারিবারিক জীবনের জটিলতায় অধিকাংশ সময় ভীত থাকতেন। সেই ভয়টা কীসের তার পুরোটা তারা না জানলেও বিচ্ছেদ হওয়া সম্পর্কের সন্তান সোয়াদকে কাছে না পাওয়া নিয়ে তার হতাশা ছিল। হতাশা থেকে বের হতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেও কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন এমন প্রশ্নে সহকর্মীরা আরও বলছেন, ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে কোন একটা মুহুর্তে হয়তো তিনি আস্থার আর কোনও অবলম্বন দেখতে পাননি।
উল্লেখ্য, মৃতদেহের পাশে পাওয়া সুইসাইড নোটে এই শিক্ষক তার ওপর মানসিক শারীরিক চাপের কথা উল্লেখ করে গেছেন। বিভাগীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই বাক্যকে সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
শুক্রবার বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ডরমেটরি জুবেরির কক্ষে আক্তার জাহানের মরদেহ পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে চিহ্নিত করা হলেও বিভাগীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, আত্মহত্যার ঘটনা এমনি এমনি ঘটে না। তিনি যদি আত্মহত্যা করে থাকেন তাতেও প্ররোচনা আছে। এর সঠিক তদন্ত হওয়া জরুরি।
মায়ের (আক্তার জাহান) সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না–তার ছেলের এমন ফোনের ভিত্তিতে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান কাছের সহকর্মী এক সময়ের ছাত্র কাজী মামুন হায়দার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আপা কিসের যেন একটা ভয় নিয়ে বসবাস করছিলেন সেটা টের পেতাম। উনি তার লকারটা খুলতেও যেন ভয় পেতেন। আপা পারিবারিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন অনেকদিন ধরেই। আমার বাসায় আসতেন, আমার ছেলের সঙ্গে খেলতেন। আমি শুক্রবার সাড়ে তিনটার দিকে খবর পেয়ে দৌড়ে জুবেরি পৌঁছাই। সেখানে পুলিশ আসতে মিনিট পনেরো লাগে। তার কক্ষের সামনে গিয়ে একটা কাঠের ভেন্টিলেটার ভেঙে আমি প্রথম মশারির নিচে শোয়া ম্যাডামকে দেখি।
বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক মশিহুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ আক্তার জাহান হতাশার মধ্যে আছেন সেটা আমার কখনোই মনে হয়নি। তার পারিবারিক কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল সেগুলো কাটিয়ে উঠেছিলেন বলেই মনে হচ্ছিল। কেননা, তিনি সবার বিষয়ে খোঁজ খবর করা, ভালমন্দ রান্না করে কলিগদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া এসব কাজের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। জলি অনেক বেশি সংবেদনশীল ছিলেন। কয়েকদিন আগেই তিনি আমাদের বাসায় এসে আমার বউয়ের সঙ্গে দেখা করে গেছেন। কখনোই হতাশ মনে হয়নি বলেই আমরা হতচকিত হয়ে গেছি তার আত্মহত্যার ঘটনায়।’
তিনি আরও বলেন,‘আমার প্রশাসনিক আর বিভাগীয় সভা একই দিনে পড়ে যাওয়ায় বিভাগের সভায় আমি থাকতে পারব না বলে জানিয়েছিলাম। সে সময় সেও আমাকে বলে ৬ তারিখ আমিও ঢাকায় চলে যাব, সভায় থাকতে পারব না। এরই ভেতর শুক্রবার বিকেলে এই দুঃসংবাদ।’
বিভাগের বাইরেও সহকর্মী ও তাদের পরিবারের বিষয়ে খোঁজ খবর রাখা প্রসঙ্গে বিভাগের শিক্ষক মামুন আব্দুল কাইয়ুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল সম্পর্কের বাইরেও কী ভীষণ সামাজিক মানুষ ছিলেন তিনি।’ কাইয়ুম বলেন, ‘তিনি আমাদের অনেকের সঙ্গেই তার পারিবারিক জীবনের হতাশা নানা সময়ে শেয়ার করেছেন। কিন্তু অনেক অসুস্থতা সত্ত্বেও রান্না করে কলিগদের বাসায় পাঠানো, নিয়মিত সহকর্মীদের ফ্যামিলির খবর নেওয়া, বিভাগে কারও অসুস্থতায় সাহায্যের আবেদনে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সহযোগিতা করা এসব তার সহজাত ছিল।’
তাই এমন একজন মানুষ কেন আত্মহত্যা করবেন তার মনস্তাত্ত্বিক কোনও ব্যাখ্যা নেই এই সহকর্মীর কাছে।
/টিএন/








