বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের সময়টায় রাজধানী ঢাকার পরিবেশ থাকে অনেক ভালো, বাতাসে দূষণের মাত্রা থাকে প্রায় অর্ধেকের চেয়েও কম। কারণ, এই সময় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ ঢাকা ছেড়ে চলে যায়। লোকসংখ্যার সঙ্গেই পরিবেশ ও বায়ু দূষণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বায়ু দূষণকবলিত শহরগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকা অন্যতম। প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে বায়ু দূষণের কারণে। ৬৫ লাখ মানুষ গুরুতর ও ৮৫ লাখ মানুষ ভোগেন কম গুরুতর অসুস্থতায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজধানীতে চলাচলরত গাড়ি, ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চল, ইট ভাটা ও নাগরিক বর্জ্য থেকে পরিবেশ দূষণ হয়। এখানে যখন মানুষ বেশি থাকে, তখন কল-কারখানা খোলা থাকে বেশি এবং যানবাহনের বিরতিহীন যাতায়াতে বাতাসে কার্বনের মাত্রাও বৃদ্ধি পায় বেশি। আর ঈদের সময় ঢাকা থেকে বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে এবং দেশের বাইরে যাওয়াতে এ সময়ে ঢাকার বায়ু এবং পরিবেশ থাকে বছরের অন্য সময়ের চেয়ে অনেক কম দূষিত।
পরিবেশ অধিদফতর থেকে জানা গেছে, প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস এই রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় বসবাসরত মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহর দূষণের বিষয়টি। ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন রাস্তায় দেড়শোরও বেশি নতুন প্রাইভেটকার যুক্ত হচ্ছে। আবার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সচল গাড়ির ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে সিএনজিচালিত গাড়ি থেকে বের হওয়া ক্ষতিকারক বেনজিন। আর এই বেনজিনের কারণে ঢাকায় ক্যান্সারের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া সালফার ও সিসাযুক্ত পেট্রোল ব্যবহার, জ্বালানি তেলে ভেজাল ও ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে এসব গাড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে কার্বন-ডাই অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার-ডাই অক্সাইড, অ্যালিহাইডসহ সিসা নিঃসারিত হয়ে বাতাসকে দূষিত করছে।
পরিবেশ অধিদফতরের ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়ারনমেন্ট (নির্মলবায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প) যানবাহন, কলকারখানা, ইটভাটা থেকে নিঃসরিত বায়ু, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ কাজের ফলে সৃষ্ট ধুলোবালি, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো থেকে নিঃসরণ এবং বিভিন্ন খনিতে সৃষ্ট দূষণকেই বায়ু দূষণের কারণ হিসেবে নির্ণয় করা হয়েছে। আর পরিবেশবিদদের মতে, ঈদের সময়ে এর প্রতিটি বিষয়ই কম থাকে বলে এ সময়ে ঢাকার বায়ু দূষিত থাকার মাত্রা অনেকখানি কম থাকে।
পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (তদন্ত) সাইফুল আশ্রাব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের সময়টাতে অবশ্যই ঢাকার দূষণ কম হয়। কারন, তখন যানবাহন কম চলাচল করে যার কারণে যানবাহন থেকে নিঃসরিত কালো ধোঁয়া কমে যায়। অপরদিকে ঢাকার আশেপাশের কলকারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকে। সেগুলো বন্ধ থাকায় পারিপার্শ্বিক বাতাসের গুণগত মান ভালো থাকায় বাতাস বিশুদ্ধ থাকে।’
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, ‘শুধু ঢাকা না, যে কোনও শহরের জনসংখ্যার সঙ্গেই সেখানকার পরিবেশের সম্পর্ক আছে। ঈদের সময়ে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ ঢাকা ছাড়ে। কেউ গ্রামে যায় আবার কেউ যায় বিদেশে। ফলে ঈদের এ সময়ে ঢাকার বাতাসের গুণগত মান ভালো থাকে। বায়ু দূষণ এ সময়ে অনেক কম হয়।’
আবু নাসের খান আরও বলেন, ‘বায়ু ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ যানবাহনের ধোঁয়া। মানুষ কম থাকায় যানবাহনও কম চলাচল করে। তাই এসময় গাড়ির ধোঁয়া কম হয় যেটা ঢাকার বাতাসকে ‘বিষ’ করে দেয়। আর এই বিষ বাতাস মানুষের ফুসফুসকে অকেজো করে দিচ্ছে, মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’
ঢাকা শিশু হাসপাতালের এক জরিপের কথা উল্লেখ করে আবু নাসের খান বলেন, ঢাকার ১১টি এলাকায় পাঁচ শতাধিক মানুষের ওপর একটি গবেষণা চালিয়ে এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে যে, ফুসফুসের সক্রিয়তা (পিএফটি, পালমোনারি ফাংশন টেস্ট) পরীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার ২৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ মানুষ ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত। যাদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও হাঁপানি, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
/এএ/








