গুলশান ও শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার পরে গোটা বাংলাদেশে নারী জঙ্গিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। নারী জঙ্গিদের একাংশ পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছে। কিন্তু দু’বছর আগেই খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর নারী জঙ্গিদের অস্তিত্বের কথা তদন্তে জানা গিয়েছিল। এমনকী, তাদের এক জন শীর্ষ প্রশিক্ষকের নামও জেনেছিলেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। তার পরেও খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণস্থল থেকে দু’জন নারী জঙ্গিকে গ্রেফতার করা ছাড়া, তাদের বিরুদ্ধে গত প্রায় দু’বছরে কোনও সাফল্য আসেনি।
খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার শুনানি গত ২০ আগস্ট কলকাতার নগর দায়রা আদালতের মুখ্য বিচারকের এজলাসে শুরু হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আগামী শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর। খাগড়াগড় মামলায় অভিযুক্ত ও জেএমবি’র নারী জঙ্গি সন্দেহে গ্রেফতার রাজিয়া বিবি ও আলিমা বিবি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেয়, তাদের শিশু সন্তানদের কোলে করে। কিন্তু কোথায় গেল তাদের মাস্টারমাইন্ডরা? কিংবা তাদের সতীর্থেরা?
খাগড়াগড় মামলায় ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’-দের যে তালিকা ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) প্রকাশ করেছে, তাতেও কোনও নারী জঙ্গির নাম নেই। অথচ বিস্ফোরণের তদন্তে নামার কিছু দিন পরেই গোয়েন্দারা জানতে পারেন, বর্ধমানের আয়েশা বিবিই মুর্শিদাবাদের মকিনগর মাদ্রাসা আর বর্ধমানের শিমুলিয়া মাদ্রাসায় নারী জঙ্গিদের জিহাদি প্রশিক্ষণ দিতো। এই আয়েশা বিবি আর কেউ নয়, শিমুলিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি’র মাস্টারমাইন্ড ইউসুফ গাজীর স্ত্রী। এই মামলায় ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সস্ত্রীক ইউসুফ ওই বিস্ফোরণের পর থেকেই পলাতক। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, বাংলাদেশে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় এক যোগে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ইউসুফ এপার থেকে ওপারে গিয়েছিল নাশকতা ঘটাতে।
এনআইএ তদন্তে জেনেছিল, বীরভূম জেলার চার তরুণী জিন্নাতুর বিবি, জরিনা বিবি, রুম্পা খাতুন ও খালেদা বিবি আয়েশার কাছে শিমুলিয়া ও মকিমনগর মাদ্রাসায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আয়েশা তাদের জিহাদি শিক্ষার পাঠ, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও বোমা তৈরির প্রাথমিক তালিম দিয়েছিল। তাদের কারও খোঁজ মেলেনি।
এনআইএ-র এক শীর্ষ কর্মকর্তা ‘বাংলা ট্রিবিউন’-কে বলেন, ‘‘আমরা শুধু এই চার জন আর আয়েশার নামই নয়, পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি’র আরও কয়েক জন নারী জঙ্গির কথা জেনেছিলাম। তাদের একাংশ বাংলাদেশে আত্মগোপন করেছে, কয়েক জন দক্ষিণ ভারতে পালিয়ে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করছে।আমরা ওদের ধরার জন্য নজরদারি করছি।’’ কিন্তু আয়েশা যেখানে জেএমবি’র শীর্ষ নেত্রী এবং প্রশিক্ষক, সেখানে তার নাম কেন ওয়ান্টেড লিস্ট বা চার্জশিটে নেই? এ প্রশ্নে ওই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার ব্যাখ্যা, ‘‘ইউসুফের নাম তো আছে! ওর জন্য আমরা ১০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছি। আলাদাভাবে আর আয়েশাকে ওয়ান্টেড লিস্ট-এ রাখার প্রয়োজন আছে বলে আমাদের মনে হয়নি।’’
তবে এনআইএ-র একটি সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গে জেএমবি’র কোনও কোনও নারী জঙ্গি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। জেএমবি-তে তাদের মগজধোলাই হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু খাগড়াগড়ের জঙ্গি আস্তানার সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগ পাওয়া যায়নি। তাই, তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
কী করে জানা গিয়েছিল জেএমবি-র নারী জঙ্গিদের কথা?
খাগড়াগড়ে ভয়ঙ্কর শব্দে বিস্ফোরণ হওয়ার কিছুক্ষণ পরের ঘটনা। পুলিশ, দমকলকর্মী ও স্থানীয় মানুষ বাড়ির দোতলায় বিস্ফোরণস্থলে ঢুকতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের পথ আটকে রুখে দাঁড়াল দুই মহিলা। লোহার গ্রিলের স্লাইডিং দরজায় ভেতর থেকে ততক্ষণে তারা তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।
ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন স্বরে হুঁশিয়ারি দিলো দুই মহিলা, ‘‘এখানে কিচ্ছু হয়নি। কারও ঢোকার দরকার নেই। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটেছে। এখানে শুধু মেয়েরা আছে। তাই, কেউ ঢুকতে পারবে না।’’ কিন্তু পুলিশ ও এলাকার মানুষ তো বুঝে গেছেন, মামুলি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, অনেক বড় কিছু হয়েছে। তাই, তাদের কথায় আমল না দিয়ে তারা ঢুকতে গেলেন। তখন ওই দু’মহিলা গুলি করার ও গোটা এলাকা বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়!
ওই দুই মহিলাই হলো, রাজিয়া বিবি ও আলিমা বিবি। তারা দু’জন যখন বহিরাগতদের বিস্ফোরণস্থলে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে, ততক্ষণে রাজিয়ার স্বামী শাকিল গাজী বিস্ফোরণে নিহত ও আলিমার স্বামী আবদুল হাকিম গুরুতর জখম হয়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ভেতরের ঘর, যেটা ছিল জেএমবি-র বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির ছোটখাটো কারখানা।
তার পরেও ওই দুই মহিলার অবিচল মনোভাব দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন পুলিশের কর্মকর্তারা। তারা যে কতটা কট্টর সন্ত্রাসী, সেটা ওই দুই মহিলার সেদিনের মনোভাব থেকেই বোঝা গিয়েছিল।
খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলার এক তদন্তকারী কর্মকর্তার কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে এর আগে আমরা কট্টর মাওবাদী মহিলা জঙ্গিদের দেখেছি। কিন্তু এই রাজ্যে জিহাদি মহিলা জঙ্গিদের সঙ্গে ওই প্রথম সাক্ষাৎ।’’
/এপিএইচ/আপ-এসএনএইচ/








