রাজশাহী কারাগারে নারী কয়েদিদের সঙ্গে শিশুদের রাখার ব্যবস্থা থাকলেও তা অপ্রতুল বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। মায়ের কাছে থাকার অধিকার যেমন শিশুটির আছে, তেমনই একটি স্বাভাবিক পরিবেশ পাওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে দিতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মায়ের সঙ্গে শিশুদের রাখা হলেও বাড়তি যত্ন বলতে অন্যদের তুলনায় তারা পাচ্ছে শুধুমাত্র দুধ-চিনি। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একজন শিশুকে কারাগারে রাখার জন্য যে ব্যবস্থাপনা দরকার তার কিছুই জেলা কারাগারগুলোতে নেই। কারাগারের ভেতর শিশুদের রাখতে মায়েরও বাড়তি যত্ন দরকার, সে বিষয়টিও একেবারেই নজরে নেওয়া হয় না।
প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিনেন্স ১৯৬০, কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন ২০০৬ এবং শিশু আইন ২০১৩ মোতাবেক সমাজসেবা অধিদফতর প্রবেশন ও আফটার কেয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়াও কারাগারে আটক শিশুদের মুক্তির লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের সঙ্গেও প্রবেশন ও আফটার কেয়ার কার্যক্রমের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কিন্তু অভিভাবকের অপরাধের কারণে যেসব অভিভাবকহীন শিশুরা কারাগারে আসতে বাধ্য হয় তাদের জন্য কোনও সুব্যবস্থা নেই, মনিটরিংও নেই।
রাজশাহী কারাগারে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে ১৩৯ জন নারী কয়েদি রয়েছেন সেখানে। তাদের মধ্যে সঙ্গে শিশু আছে ১০ জনের। কারাগারের জেলার শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব নারীদের শিশু আছে, তাদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হয়। আর শিশুর বয়স ছয় বছর হয়ে গেলে তাকে পরিবারের অভিভাবকের কাছে দেওয়া হয়।’
যদি অভিভাবক বাচ্চাটিকে গ্রহণ করতে না চান সেক্ষেত্রে কী করণীয়- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেক্ষেত্রে তাদের সরকারি শিশুসদনে রাখা হয়।’ এদের জন্য বাড়তি কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় প্রশ্নে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘শিশুসহ নারী কয়েদিদের অন্যদের বন্দিদের চেয়ে বাড়তি করে দুধ-চিনি দেওয়া হয়।’
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা নেই। সেখানে সমাজের চোখে যে অপরাধী তার শিশু কী করলো বা করলো না তা নিয়ে ভাবার কেউ নেই। রাজধানীর কারাগারে বিষয়টা অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও জেলা পর্যায়ে মনিটরিং করার কেউ না থাকায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।’
সমাজসেবা অধিদফতরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিশুদের বিষয়টি নিয়ে নানা প্রকল্প নেওয়া হয় বটে। কিন্তু যারা বাস্তবায়ন করবেন তারা সংবেদনশীল না হওয়ায় অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। শিশু কারাগারে কেন থাকবে? তার জন্য অন্য ব্যবস্থা কেন থাকবে না? আমরা উন্নত দেশের নানা উদাহরণ দেই কিন্তু বেশিরভাগ থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুস্থ পরিবেশটা পর্যন্ত দিতে পারি না।’
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) শিশু সুরক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা শাবনাজ জাহেরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব শিশুদের ভালো জায়গায় রাখা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং তাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাও রাখার কথা। প্রথমত শিশুদের কারাগারে রাখার নিয়মই থাকা উচিত না। কিন্তু যেহেতু আইনে আছে সাত বছরের আগ পর্যন্ত সে তার মায়ের কাছে থাকবে সেহেতু এই সময়ে তার মানসিক বিকাশে যা যা করণীয় সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের দেখভাল ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেজন্য জেলা পর্যায়ে একটা টাস্কফোর্স আছে। যেখানে সরকারের প্রতিনিধি, বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ প্রশাসক থাকেন। কারাগারগুলো পর্যবেক্ষণ করে নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি করে সেটা কেন্দ্রে পাঠানোর কথা। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোয়ালিটি বজায় রাখার জন্য যে মনিটরিং ব্যবস্থা তা নেই, শুধুমাত্র কোয়ানটিটি মনিটরিং করা হয়।’
/এমও/এফএস/
আরও পড়ুন: আমার ছেলে আন্দালিব জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত নয়: চুন্নু








