বন্ধুরা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে সামনের এসএসসি পরীক্ষায় বসার। আর মরিয়ম তার ডান হাতের ক্ষত নিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। ‘এমন হবার কোনও কারণ ছিল না’ বলেই মরিয়ম তার হাত দেখিয়ে জানায়, ‘আমি কীভাবে পরীক্ষা দেবো। ডান হাত গত চার মাস ধরে সাপোর্ট দিয়ে উঁচু করে রাখা।’
চার বন্ধু মিলে প্রাইভেট পড়ে বাসায় ফেরার পথে এক বখাটের বটির আঘাতে এক বন্ধু কনিকা নিহত হয়। আর ছিন্ন হয়ে যায় মরিয়মের ডান হাত। কাতর হয়ে মরিয়ম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। মামা আব্দুল কাদের তার মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের মেয়ে কোনও উপায়ে যদি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতো। ক্লাসে একশো জনের মধ্যে সে সামনের সারির শিক্ষার্থী।’
ঘটনা ২৭ মে, সকাল ৯ টার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহিপুরে এক স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক বখাটে যুবক। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও তিন ছাত্রী। তাদেরই একজন বেহুলা গ্রামের মরিয়ম আক্তার।কী হয়েছিল সেদিন জানতে চাইলে সে বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘আমরা চার বান্ধবী প্রাইভেট থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে এসে এক ছেলে বেপরোয়া কোপানো শুরু করে। আমার জ্ঞান ছিল না। এর বেশি আমি জানি না। আমার এক বান্ধবী ওই ঘটনায় মারা যায়।’ ছেলেটিকে চিনতে পেরেছিল কিনা বা কেন এমন ঘটনা সে ঘটালো প্রশ্নে মরিয়ম বলে, ‘আমি দেখিনি ঠিক মতো। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছিল।’
চিকিৎসার এক পর্যায়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাকে সহায়তা দিতে এগিয়ে আসলে ঢাকায় আসা মরিয়মের সাথে কথা হয় এই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের অফিসে। চার মাস পর সেদিনের কথাগুলো বলতে গিয়ে একই রকম ব্যাথা অনুভব করছে ছোট্ট এই মেয়েটি। যেন এখনও চোখে প্রশ্নে নিয়ে ঘুরছে, ‘আমার কী দোষ ছিল।আমরা কারোর ক্ষতি করিনি। আমার স্বাভাবিক জীবন নেই কেন।’
মরিয়মের মামা বলেন, ‘মহিপুর ডিগ্রি কলেজের পেছনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। এরা সবাই মহিপুর এসএএম দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ঘাতক বখাটে যুবক আবদুল মালেককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেন। সে বালুগাঁ দিয়াড় গ্রামের আবদুল লতিফের ছেলে। এখনও মামলাটি তদন্তাধীন। এখন ওই ছেলে যদি স্বীকার করে কেন সে এমন একটা কাজ করলো।’ মরিয়মের মা পাশেই চুপ করে বসেছিলেন। সমাজের প্রতি অভিমানী এই মা বলেন, ‘আমার মেয়েটা যেন সুস্থ হয় এই দোয়া করবেন।কেবল সাক্ষী থাকবে না কোনও, বিচার হবে না এই হত্যাকারীর বলেই হাতেনাতে ধরার পরও এলাকার মানুষ ওরে বাঁচায়ে রাখসে। নাহলে সেদিন গণপিটুনিতেই তার মৃত্যু হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মেয়ে এবং আমরা যে কষ্ট করার তাতো করছিই। বাকিটা যদি এই অন্যায়ের বিচার দেখে যেতে পারি।’
আহত তিনজনই কনিকার সহপাঠী। এরমধ্যে একই গ্রামের আবদুল খালেকের মেয়ে তারিন আফরোজ (১৫) ও অরুণবাড়ী মহিপুর গ্রামের তাজেমুল হকের মেয়ে তানজিমা আক্তারকে (১৪) রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং বেহুলা গ্রামের মকবুল হোসেনের মেয়ে মরিয়ম আক্তারকে (১৪) স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
অন্য বন্ধুরা? তাদের কী অবস্থা প্রশ্নে আবারও সেদিনের কথায় ফিরে যায় মেয়েটি। শান্ত কণ্ঠে, শারিরীক ব্যথা সহ্য করার অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে ধীরে ধীরে বলে, ‘বখাটে আবদুল মালেক পেছন থেকে এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আঘাত করলে কনিকা মাটিতে পড়ে যায়। মালেকের হাঁসুয়ার কোপে তারিন, তানজিমাও গুরুতর আহত হয়। কিন্তু আমার আঘাতের পরিমাণ বেশি ছিল এবং আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।আমার অন্য দুই জীবিত বন্ধুর আর্তচিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে আমাদের উদ্ধার করে।’
দৈনিক সংবাদপত্র ও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নিজস্ব তথ্য বলছে, এবছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বখাটেদের উৎপাতের ঘটনা ঘটেছে ১৬৯টি। যার মধ্যে বখাটে কর্তৃক এবং পরবর্তীতে প্রতিবাদ করায় হয়রানির শিকার হয়েছেন ৯৮ জন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩২০। যেখানে বখাটে কর্তৃক এবং পরবর্তীতে প্রতিবাদ করায় হয়রানির শিকার হয়েছেন ২১১ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই মামলাগুলোর কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে দেখা যায় না। মরিয়মদের এই ঘটনাটি গত মাসে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীকে চুরিকাঘাতে হত্যা ঘটনার আগের। চাপাইনবাবগেঞ্জের এই ঘটনার যদি বিচার প্রক্রিয়ায় কোনও অগ্রগতি দেখা যেত, তাহলে এধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কম হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে চার মাস পেরিয়ে গেছে। হাতে-নাতে ধরা পরা আসামির ক্ষেত্রে এতদিনে চার্জশিট না দিতে পারাটা একেবারেই অবহেলা ছাড়া কিছু না।’
এপিএইচ/








