‘সড়ক দুর্ঘটনায় আমার ছেলে ইমন আহত হওয়ার পরপরই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। এরপর থেকে প্রতি সোমবার তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসতে হয় আমাদের। এভাবে চলছে গত ২৬ জুলাই থেকে আমাদের হাসপাতাল আর বাড়িতে যাওয়া-আসা। এর ওপর আছে চিকিৎসা খরচ। প্রতিদিন ৩০০ টাকার মূল্যের ইনজেকশন দিতে হয়, ডাক্তারকে দিতে হয় আরও ১০০ টাকা। আর ড্রেসিং করতে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা। কারও সন্তান এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকলে সংসার আউলা হয়ে যায়। বাবা-মায়ের কষ্টের সীমা থাকে না।’ জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) ইমনের মা মরিয়ম বেগম এভাবে নিজেদের দুর্ভোগের কথাগুলো বলছিলেন।
মরিয়ম বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার দিন ইমন রাস্তায় খেলতে যায়। এ সময় একটি মোটরসাইকেল তাকে ধাক্কা দিলে তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচের দুই হাড় ভেঙে যায়। এখন তাকে নিয়ে আমরা হাসপাতাল আর বাড়িতে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। এই দুর্ভোগ কবে যে শেষ হবে, বলতে পারি না।’
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয় ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার ১৭ বছরের কিশোর ট্রাকের হেলপার আকাশ। সেখানে কথা হয়, তার মা হাওয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আকাশ কোনও দিন যায়নি। সেদিনই কয়ডা টাকার লাইগ্যা ট্রাকের হেলপারি করতে গেছিলো, পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাক ব্রেক ফেল কইরা উল্টে পড়েছিল খাদের পানিতে। সেখান থেইক্যাই আমার পোলাডা এমন হইয়া গেল।’ তিনি আরও বলেন, ‘কী করে যে সংসার চলে, তা কেবল আমি আর ওর বাপই জানি। কিন্তু তাই বলে তো ছেলের চিকিৎসা না করিয়ে পারি না। গৃহস্থালী কাজ করে ওর বাপ। দুটি গরু আর একখণ্ড জমি বিক্রি করেছি। আর তো কিছু নেই। তয় এখানে আনার পর হাসপাতাল থেকেই বেশিরভাগ ওষুধ দেয়, কিছু কিছু ওষুধ বাইরে থেকেও কিনতে হয়।’ চিকিৎসাধীন ছেলের মাথার পাশে বসে আছেন তিনি। একবার উঠে তার পা ঠিক করে দিচ্ছেন, হাত ঠিক করে দিচ্ছেন। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে মাঝে-মাঝেই আঁচলে চোখ মুছছেন। দিনের পর দিন ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন, এখনও চিকিৎসকরা ঠিক করে বলতে পারছেন না, আকাশ কতদিনে সুস্থ হয়ে উঠবে।
শুধু আকাশ কিংবা ইমন নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় এভাবে প্রতিদিনই পঙ্গু হয়ে পড়ছে কোনও না কোনও কিশোর-শিশু, এমনকি পরিণত বয়সের নারীপুরুষও। সড়ক দুর্ঘটনায় দুর্ভোগের শিকার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আহতদের যন্ত্রণা, কষ্ট ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। আর এর ব্যয়টাও দীর্ঘসময় ধরে চালিয়ে যেতে হয়। পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া তারা চলতে পারে না। আর এতে সংসারের অন্য সদস্যদের প্রতি মনোযোগ দেওয়াসহ নিত্যকাজে অনিয়ম চলে আসে, পুরো সংসারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, পিরোজপুরের ১৪ বছরের তামিম সিকদার, পোশাক কারখানায় কাজ করা মো. আল আমিন, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ১৭ বছরের ইমন, রাব্বী, সাইদুলরা হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। তারা জানায়, জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেছে, এ কেবলই বিষাদের কাহিনি।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক জরিপে উঠে এসেছে, এবারের কোরবানির ঈদের আগে-পরে ১৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২৪৮ জন। এতে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬ জন। আটটি নৌ-দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হন। আহত হন ৩০ জন। ৭জন মারা গেছেন ট্রেনে কাটা পড়ে আর দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫০ জন। এদিকে, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আট হাজার ৬৪২জন, আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন।
গত সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) পঙ্গু হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের সংখ্যাই বেশি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রার খাতা থেকে জানা যায়, এবারের ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে প্রতিদিন এসেছেন ৭০ থেকে ১০০ জন। কেবল ১৯ সেপ্টেম্বরই সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এসেছেন ৪৭ জন।
ঈদের ছুটির সময়ে এ সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে বলে জানান হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স কাজী হামিদা আক্তার বানু। তিনি বলেন, ‘ঈদের সময়দ রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, গত দুই/তিন বছরে সেটা আরও বেড়েছে।’
ঢাকার একটি মার্কেটের দোকান কর্মচারী হাসান ঈদের দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ যাচ্ছিলেন গ্রামের বাড়িতে বোন, বোনজামাই, ভাগ্নেসহ। কিন্তু ঈদ আর করা হয়নি বাড়িতে তাদের। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসান এখন পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায়।
পঙ্গু হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেদিন বাড়ি যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় একটি লেগুনার আঘাতে আমাদের সিএনজির সামনের অংশটা ভেঙে যায়। আহত হন হাসানসহ পরিবারের তিনজন। বোনের চোখের ওপরে সাতটা এবং বোনজামাইয়ের নাকে সেলাই দেওয়া হয় আটটা।’ হাসান বলেন, ‘সেদিন সকালেই পঙ্গু হাসপাতালে আসি, কী যে অসহ্য যন্ত্রণা, এটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। আজ অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, তার অপেক্ষায় আছি।’ হাসানের পাশে দাঁড়ানো তার মা আকলিমা বেগম বলেন, ‘কোরবানির জন্য খাসি কেনা হইছিল, সবই করা হতো ঠিক মতো, কিন্তু ওদের অ্যাকসিডেন্ট সব মাটি করে দিয়েছে।’
বুয়েটের দুর্ঘটনার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, চালকের অদক্ষতা, মোবাইল ফোনে কথা বলা, খেয়ালিপণা, ফাঁকা রাস্তা পেয়ে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবসহ ফিটনেসবিহীন গাড়ি, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, ফুটপাত দখল, ওভারটেকিং, রাস্তার নির্মাণ ত্রুটি, গাড়ির ত্রুটি, যাত্রীদের অসতর্কতা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা ও না মানা, নির্ধারিত গতিসীমা মান্য না করা, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ঈদের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ও রাস্তায় ওভারটেক করার তীব্র মানসিকতার কারণে মহাসড়কগুলোতে বিশেষ করে ঈদের সময়ে মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) যুগ্ম-পরিচালক ডা. নাজিমুন নেছা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোন রাস্তা দিয়ে ট্রাক, কোন রাস্তায় বাস এবং রিকসাসহ ছোট যানবাহন চলবে তার একটি পরিকল্পনার অভাব খুব বেশি বোধ করছি এই দুর্ঘটনায় আহতদের দেখে। অদক্ষ চালক কিংবা হেলপারের হাতে যে ট্রাক সে তার পাশের রিকসাকে চাপা দিলে কিংবা ধাক্কা দিলে তার যে কী অবস্থা হতে পারে, সেটা কেবল ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবে, এই দুর্ভোগের কোনও অন্ত নেই। এই হাসপাতালে আমরা জায়গা দিতে পারি না, এত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে দেশে। ’
ডা. নাজিমুন নেছা আরও বলেন, ‘যারা গাড়ির ফিটনেস দেয়, তাদের ক্লোজওয়াচে দেখা উচিত। যেন তারা আসলেই ফিট গাড়িকে সার্টিফিকেট দিচ্ছে কিনা, এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি যে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এটা সবাইকে দিয়ে বুঝতে হবে।’
/এমএনএইচ/








