অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের দাবির মুখে অবশেষে শিশুদের ওপর থেকে পাঠ্যবইয়ের বোঝা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে পাঠ্যবইয়ের মানোন্নয়ন, ভাষা সহজ-সরল করে সহজবোধ্য করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েকবছর আগে থেকেই শিশুরা পিঠে বাড়তি বইয়ের ব্যাগ বহন করছে। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ১০টি খাতা, ডায়েরি, জ্যামিতি বক্স, টিফিন বক্স, পানির ফ্ল্যাস্ক ও স্কেলসহ অন্যান্য জিনিসের ভারে শিশুদের অবস্থা হয়ে যায় নাজেহাল। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে অভিভাবকদেরকেও বইয়ের ব্যাগ বহন করতে হিমশিম খেতে হয়। তাছাড়া বয়স অনুযায়ী বইয়ের সংখ্যাও বেশি। এ বাস্তবতায় বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা শিশুদের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। অভিভাবকরা এই দাবি নিয়ে বেশ কয়েকবার মানববন্ধনও করেছেন।
পরে গত ২৬ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০১৬ এর উদ্বোধনী দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের মুক্ত আলোচনায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। তখন প্রধনমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গত ২৯ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, শ্রেণিভেদে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া শিক্ষাসংক্রান্ত একটি সমস্যা। প্রথম শ্রেণি থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর বয়স বাড়ে এক বছর। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বেড়ে যায় অনেক। যেমন, পঞ্চম শ্রেণিতে যেখানে পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৬টি, ষষ্ঠ শ্রেণিতে বইয়ের সংখ্যা সেখানে বেড়ে যায় ১৩ টি। এ কারণে শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনা করে শ্রেণিভেদে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বৃদ্ধির হার সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় আনতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষার উন্নয়নে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠিত পরামর্শক কমিটির সভা ডাকা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য প্রশ্নব্যাংকও তৈরি করা হবে বলেও সভায় সিদ্ধান্ত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরে শারীরিক শিক্ষা, চারুপাঠসহ অনেক অপ্রাসঙ্গিক বই রয়েছে বলে সভায় উপস্থিত কমিটির সদস্যরা মত দেন। এসব অপ্রাসঙ্গিক বই কারিকুলাম থেকে বাদ দেওয়া যায় কিনা তা পর্যালোচনা করবে কমিটি। তাছাড়া এসব বইয়ে অনেক সহজ বিষয় কঠিন করে তুলে ধরা হয়েছে। সেটিও শিশুদের উপযোগী করে সহজবোধ্য করতে হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ বলেন, বইয়ের সংখ্যা কমানো হবে। এছাড়া বইয়ের ভাষা প্রাঞ্জল করার জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের শিক্ষাবর্ষেই নতুন সংস্করণের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা আসলেই অনেক বেশি। এত কম বয়সে এত বই থাকা উচিত নয়। অল্প বইয়ের মধ্যেই সামগ্রিক বিষয়বস্তু তুলে আনা সম্ভব। সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে’।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমানো, বই সহজবোধ্য করা এবং সময়োপযোগী করার। মন্ত্রণালয়ও আমাদের পরামর্শকে স্বাগত জানিয়েছেন’।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল বলেন, ‘বিজ্ঞান বইয়ের নিউটনের সূত্রটি এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যা দেখলেই শিক্ষার্থীরা ভয় পায়। বিজ্ঞান বইগুলো শিশুদের জন্য সহজ করে তুলে ধরা হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষা নিতে আগ্রহী হয় এবং আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা নিতে পারে’।
সভা সূত্রে জানা গেছে, এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়ণ করার জন্য ওই সভায় চারটি সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো হলো- কারিকুলাম পর্যালোচনা সাব-কমিটি, নির্বাচিত পাঠ্যপুস্তকের মান উন্নয়ন ও ভাষা প্রাঞ্জলকরণের উদ্দেশ্যে সাব-কমিটি, প্রশ্নব্যাংক সাব-কমিটি। এসব কমিটি বৈঠক করে বিষয়গুলো চূড়ান্ত করবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রমুখ।
/আরএআর/টিএন/
আরও পড়ুন: লাইফ সাপোর্ট নির্ভরতা কমছে নার্গিসের








