ইলিশের জন্য নিবেদিত একজন ইকবালের গল্প

চৌধুরী আকবর হোসেন
১৩ অক্টোবর ২০১৬, ১০:৫৩আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৪০

ইলিশের জন্য নিবেদিত ইকবাল হোসেন মাতব্বর

ইলিশ রক্ষায় দেশের ২৭ জেলার নদ-নদী ও উপকূলে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে বুধবার (১২ অক্টোবর) থেকে। এসময়ে জেলেরা যাতে নদীতে মাছ না ধরেন, সেজন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে সরকার। ঠিক এসময়ে সব বাধা উপেক্ষা করে নদীতে নামবেন ইকবাল হোসেন মাতব্বর। তবে ইলিশ ধরতে নয়, রক্ষা করতে। নদীতে ট্রলার নিয়ে পাহারা দেবেন ইলিশের জন্য নিবেদিত এই মানুষটি।

ইলিশ মাছ রক্ষা করতে প্রায় ১৯ বছর ধরে একান্ত ব্যক্তি উদ্যোগে লড়ে যাচ্ছেন ইকবাল হোসেন। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায়  জেলেদেরও উদ্বুদ্ধ করছেন তিনি । নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে লড়ে যাচ্ছেন ইলিশ রক্ষায়। স্বপ্ন দেখছেন ইলিশ হবে দেশের অন্যতম আয়ের উৎস। নিজের এই দীর্ঘ  লড়াই নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন  ইকবাল হোসেন।

আশ্বিন মাসে পূর্ণিমার সময় ডিম ছাড়তে উপকূলীয় এলাকা থেকে উজানে পদ্মা-মেঘনায় চলে আসে মা ইলিশ। এসময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধ হলেই বৃদ্ধি পাবে ইলিশ মাছের সংখ্যা। ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত ২৭ জেলার নদ-নদীতে ২২ দিন (২ নভেম্বর পর্যন্ত) ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন, মজুদ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই ২২ দিন মেঘনা নদীতে মা ইলিশ বাঁচাতে নদীতে ট্রলার  নিয়ে অভিযানে নেমে পড়েন  ইকবাল হোসেন।

নিজের ট্রলারে ইকবাল হোসেন মাতব্বর

১৯৯৮ সালে প্রথম মা ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ নেন বলে জানান  ইকবাল হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেয়াল করে দেখলাম আবছা জাল (মশারির মতো ক্ষুদ্র ছিদ্রের জাল) দিয়ে জেলেরা রেনু পোনা ধরে। এই জালে তখন প্রচুর মা ইলিশ আর জাটকা ধরা পড়ে। জাটকা খুব কম দামে বিক্রি হয়। অথচ এই মাছগুলোই কিছু দিন পরে ধরলে অনেক বেশি আর বড় মাছ ধরতে পারতেন জেলেরা।’

তিনি বলেন, ‘সেসময় স্থানীয় একটি সংগঠনের মাধ্যমে জরেপ করি, কী কারণে, কোন প্রক্রিয়ায় মাছ ধরা হয়। জেলেদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। জরিপের তথ্য জেলা প্রশাসন, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে দেই। আমার জরিপের কারণে কিনা জানি না, তবে এরপর সরকার উদ্যোগ নেয় মা ইলিশ রক্ষায়। তখন মা ইলিশ রক্ষায় নৌবাহিনী বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাতো। আমিও জেলেদের বোঝাতে চেষ্টা করতাম, যেন তারা মা ইলিশ আর জাটকা মাছ না ধরে।’

ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ ডিম পাড়ার পর বেশি ইলিশ হলেতো সেই একই জেলেদেরই লাভ। এটা বোঝানোর চেষ্টা করতাম। ট্রলার নিয়ে  নদীতে গিয়ে পাহারা দিতাম। একা একা সংঘবদ্ধ জেলেদের সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন ছিল। তবে চেষ্টা করতাম জেলা প্রশাসন, স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য কর্মকর্তারা যেন ইলিশ রক্ষায় উদ্যোগ নেন।’

গত চার বছর ধরে বরিশালের হিজলা ৬ নম্বর  ধুলখোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন  ইকবাল হোসেন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইকবাল হোসেন বলেন, ‘চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ইউনিয়নের পরিষদ থেকেও অভিযান পরিচালনা করতে পারছি। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।  মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের জন্য সরকারি চাল  যেন ঠিকভাবে বণ্টন করা হয়,সেদিকে খেয়াল রাখছি। সমস্যা হচ্ছে, জেলেরা চাল পেলেও মাছ ধরতে নদীতে নেমে পড়ে ।’

জেলেরা কেন এ সময়ে নদীতে নামেন এমন প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় প্রভাবশালী যারা তারা মাছ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারও কারও মাছের ঘাট  আছে, যেখানে জেলেরা মাছ বেচাকেনা করে। এসময় মাছ না ধরলে তাদের ঘাটগুলো বন্ধ থাকে। তাই তারাই জেলেদের নদীতে মাছ ধরতে উদ্বুদ্ধ করে।’

অবৈধ কারেন্ট জাল পোড়াচ্ছেন ইকবাল হোসেন মাতব্বর

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে তারা জেলেদের টাকা পয়সা ঋণ দেয়। এছাড়া, জেলেরা বিভিন্ন এনজিও’র কাছ থেকে সুদে ঋণ নেয়। ঋণের টাকা শোধ করতে জেলেরা মাছ ধরে। অবাক হবার বিষয়, আমার ইউনিয়নের দুটি গ্রামে কয়েকটি এনজিও প্রায় ৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে জেলেদের। দেনার বোঝা নিয়ে জেলেরা এক প্রকার বাধ্য হয় মাছ ধরতে। এজন্য আমি এনজিওগুলোর সঙ্গে  কথা বলেছি। তাদের অনুরোধ করেছি, সরকার ঘোষিত এই ২২ দিন যেন তারা কোনও জেলের কাছ থেকে কিস্তির টাকা না নেয়।’

মা ইলিশ রক্ষা করা কিভাবে সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হোসেন বলেন,  ‘প্রশাসনিকভাবে কঠোর হতে হবে। সংসদ সদস্য, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে হবে। যার যার নির্বাচনী এলাকায় কোনও জেলে এ সময়ে নদীতে নামলে তাদের নেতাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করলে তারাও তখন সক্রিয় হবেন। আমার পাশের এলাকায় চারজন ইউপি চেয়ারম্যান মাছের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা কখনও ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ নেননি। এখন ওইসব এলাকায় যারা চেয়ারম্যান তারা মাছের ব্যবসা করেন না। ফলে  সবাই যৌথভাবে অভিযান চালাতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় মাত্র একজন মৎস্য কর্মকর্তা আছেন। একজনের পক্ষে  সঠিকভাবে অভিযান চালানো সম্ভব নয়। মাত্র ২৭টি জেলায় ২২ দিন মাছ ধরা নিষেধ করা হয়েছে। এই সময়ে অন্য জেলার মৎস্য কর্মকর্তাদের এসব এলাকায় দায়িত্ব দিলে অভিযান বেশি সফল হবে।’

ইকবাল হোসেন বলেন, ‘মালদ্বীপের একমাত্র আয়ের উৎস মাছ। অথচ তারা কতো উন্নত। এই একটি জায়গা, যেখানে বাড়তি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। শুধু পরিচর্যা, সংরক্ষণ করতে হয়। আমাদের প্রচুর নদী-নালা আছে। আমরাও একটু সচেতন হলে দেশের মৎস্য খাত বৃহৎ আয়ের উৎস হবে। নিষেধাজ্ঞার এই ২২ দিন দেশের সবাই যদি সচেতনভাবে সহায়তা করেন, তাহলে আমরাও সুলভে মাছ পাবো। এবার ইলিশ মাছ বেশি ধরা পড়েছে। সেটার প্রমাণও মিলেছে।’

/সিএ  /এপিএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক