আলো জ্বালিয়ে রাখো, র‌্যাব আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১২ নভেম্বর ২০১৬, ২২:৫৩আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৬, ২২:৫৮

গুম হওয়া ব্যক্তিদের ছবি বুকে স্বজনরা

‘বাড়ির পাশে একটি লাইট বন্ধ। কোনও কারণে নষ্ট হয়ে আছে। তা দেখেই চিৎকার শুরু করলেন মা। লাইট বন্ধ কেন? লাইট জ্বালাও। আমার ছেলে বাড়ি আসবে। র‌্যাব যে কোনও সময় আমার ছেলেকে দিয়ে যাবে। অনেকদিন পর এসে অন্ধকারে বাড়ি চিনতে ভুল করবে। তোমরা আলো জ্বালিয়ে রাখো। এই বলে হাউ মাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা।’

কথাগুলো বলছিলেন আফরোজা ইসলাম আঁখি, তিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বড় বোন। ঐদিন সুমনসহ ৬ জনকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তাদের পরিবারের স্বজনরা।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর তোপখানা রোডে শিশুকল্যাণ পরিষদে ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী জাতীয় কমিটির সঙ্গে গুম ব্যক্তিদের স্বজনদের আলোচনায় নিজেদের পরিবারের হাহাকারের কথাগুলো এভাবেই তুলে ধরেন তারা।

আফরোজা ইসলাম বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় র‌্যাবের গাড়িতে করে নিয়ে গেছে। তাদের পোশাক, আর্মস সবই ছিল। কিন্তু দিনের পর দিন ঘুরে তাদের কাছ থেকে কোনও আশ্বাস পাইনি। তারা যে আটক করেছে, সেটাই স্বীকার করে না।

তবে র‌্যাব তার ছেলে সুমনকে ফিরিয়ে দেবে বলে বিশ্বাস তার মায়ের। তিনি সবসময় বলেন, যে কোনও সময় র‌্যাব তার ছেলেকে দিয়ে যাবে। চুরি হওয়া বাচ্চা উদ্ধার করতে পারলে আমার ছেলেকেও তারা ফিরিয়ে দিতে পারবে।

একমাত্র ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চান তিতুমীর কলেজের ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল আইনের লোক হবে। আজকে সে নিজেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা নির্যাতনে স্বীকার। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন।’

পল্লবী এলাকায় নিজ বাসা থেকে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট তুলে নেওয়া হয় তরিকুল ইসলাম তারা মিয়াকে। তার স্ত্রী বেবি স্বামীর ছবি বুকে জড়িয়ে বলেন, তার বিরুদ্ধে থানায় একটা জিডি পর্যন্ত নাই। তার অপরাধ একটাই সে ছাত্রদল করতো। তাই তাকে তুলে নিয়ে গেল। থানা পুলিশের পরিচয় দিয়ে তাকে নিয়ে গেল। এর পরপরই পল্লবী থানায় গেলে তারা বলে এমন কোনও টিম তারা পাঠাননি। আর তরিকুল ইসলাম নামে কেউ আটকও নেই। এরপর থেকেই খুঁজছি। কেউ তার সন্ধান দিতে পারেনি। উল্টো বিভিন্ন সময় আমরাই লুকিয়ে রেখে চাপ সৃষ্টি করছি বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা সভায় ঘটনার বর্ণনা দেন। এসময় স্বজনদের চোখে জলে এক আবেগঘন পরবেশের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন স্বজন কান্নার জন্য কথাই বলতে পারছিলেন না।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ডা. ফয়জুল হাকিম। তিনি বলেন, এদেশে শাসকদল বিরোধীদের দমন করতে প্রথমে শুরু করে ক্রসফায়ার। এ নিয়ে সবাই যখন কথা বলা শুরু করে তখনই শুরু হয় গুম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর ফিরে আসছে না তারা। নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে স্বজনদের।

জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারকে সবার আগে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে। গুমের বিরুদ্ধে সবাইকে কথা বলতে হবে। আওয়াজ তুলতে হবে। সরকারকে গুম হওয়াদের ফিরিয়ে দিতে হবে।

এর আগে ফ্যাসীবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী জাতীয় কমিটির সদস্য এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, গুমের শিকারদের স্বজনদের আন্দোলনে নামতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে স্বজনরাই কঠোর আন্দোলনে নেমে সফল হয়েছে। আমাদের দেশেও তাই করতে হবে। স্বজনদের এই সংগ্রাম বন্ধ হলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরে আসার সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আন্দোলনের কোনও বিকল্প নেই। এসময় তিনি স্বজনদের নিয়ে একসঙ্গে বড় পরিসরে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

/আরজে/এইচকে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম