নাসিরনগরে হামলার পর গত ১৪ নভেম্বর হিন্দু পরিবারের ঘর-বাড়ি ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগকারীদের বিষয়ে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও গত দশ দিনে এ বিষয়ে কোনও সাড়া মেলেনি। একটি ফোনও আসেনি পুলিশের কাছে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
তিনি এও বলেন, কারা ঘটনা ঘটিয়েছে সে ধারণা তাদের আছে। কেন পুরস্কার ঘোষণার পরও কোনও ফোন আসেনি প্রশ্নে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে ফোন আসার উদাহরণ দেখিনি কখনও।’ আর ভুক্তভোগীরা বলছেন, ‘ফোনে কার নাম বলব, আর আমাকে নিরাপত্তা কে দেবে। মিডিয়া, সরকার সবার নজরদারিতে থাকার পরও একাধিকবার হামলা ঘটলো। বিশ্বাসটা করব কাকে।’
হামলার ঘটনায় পুলিশের চার সদস্যের কমিটির করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরেই জেলার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়েছে। হামলা ঠেকাতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতিও দায়ী। এসব জানার পরও কেন পুরস্কারের ঘোষণা, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, এটা জনগণকে ইনভলভ করা। তবে কেউ সম্পৃক্ত হয়নি এই পুরস্কারের বিষয়টাতে।’
এদিকে ইন্ধনদাতাদের কারও বিরুদ্ধেই এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার একশ ছাড়িয়ে গেলেও, তাদের কেউ ইন্ধনদাতা নন বলে ভুক্তভোগীরাই দাবি করছেন। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,‘ইন্ধনদাতাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। পুরস্কারের জন্য কেউ কল না করলেও আমরা জানি তারা কারা।’
হিন্দু পরিবারের ঘর-বাড়ি ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগকারীদের বিষয়ে তথ্য প্রদানকারীদের জন্য লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ।
১৪ নভেম্বর সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুরস্কার ঘোষণার মাইকিংও করা হয়। ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কোনও তথ্য থাকলে ০১৭১৩৩৭৩৭২৪, ০১৭১৩৩৭৩৭২৫, ০১৭১৩৩৭৩৭২৭ ও ০১৭১৩৩৭৩৭৩৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। আজ (বুধবার) এ বিষয়ে ০১৭১৩৩৭৩৭২৪ নম্বরে ফোন করে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে জেলার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি ফোনও আসেনি। পরিচয় গোপন রাখার কথা বলা হলেও তারা ভয়ভীতির মধ্যেই আছে মনে হয়।’
নিজ বাড়ির মন্দির ধ্বংস হয়েছে এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি হয়তো মুখে সবাইকে চিনতে পারিনি। কিন্তু পুরো ঘটনা কিভাবে ঘটেছে এটা এখন সবাই জানেন। এর জন্য টাকার লোভ দেখিয়ে আমাদেরকে জড়ানোর কোনও মানে হয় না। আর বাকি যারা বিষয়টি দেখেছে, তারা কেউই পুলিশি ঝামেলায় জড়াতে চান না।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যখন পুলিশ কিছু করতে পারছে না, তখন এধরনের টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা আই ওয়াশ। তারা যে আসলে কিছু করত আগ্রহী সেটাই দেখাতে চায়। তাদের জানা নাই, কোন কোন্দলে কারা এসব করছে? এধরনের বিষয়গুলোর কারণে জনগণ পুলিশের ওপর আস্থা আরও হারিয়ে ফেলে। পুলিশ ও র্যাবের টহলের পরও ঘরে আগুন জ্বলছে, আর আপনি মনে করছেন, একলাখ টাকার বিনিময়ে কেউ আপনাকে খবর দেবে।’
উল্লেখ্য,ধর্মীয় অবমাননার কথা বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কথিত পোস্ট দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও ঘর-বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরবর্তীতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও গত ৪ নভেম্বর ভোরে উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাঁচটি রানাঘর ও গোয়াল ঘরে এবং ১৩ নভেম্বর ভোরে একটি বাড়ির মাছ ধরার জালে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘যাদের মাথায় ছাদ নাই, যাদের উপাসনালয় গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা জানলেও পুলিশের কাছে কারোর নাম বলবেন বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। প্রায় একমাস হতে চলা এ ঘটনার কোনও সুরাহা হবে না, এটা অবিশ্বাস্য না। চার বছর আগের রামুর ঘটনারই কিছু হয়নি ‘তিনি আরও বলেন,‘রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার কেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কেই হতে হবে, সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠলেও উত্তর নেই।’
/এপিএইচ/আপ-এসটি








