প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজে ত্রুটির ঘটনা মানবসৃষ্ট। এ ঘটনায় গঠিত পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ত্রুটির ঘটনায় ‘নাশকতা’র উদ্দেশ্য ছিল কিনা- তা তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি। এই পরামর্শের আলোকেই ‘নাশকতা’ খুঁজতে মামলা করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ দুয়েকদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেবেন মন্ত্রী। এছাড়া তিনটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের চিহ্নিত করে মামলা করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোন আইনে ও কাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে তা ঠিক করবেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। দুয়েকদিনের মধ্যে মামলা করা হবে বলেও নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
মামলার বিষয়ে রবিবার (১৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলা তো হতেই হবে। কবে নাগাদ মামলা হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’ তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নামে এসেছে তাদের দায়ী করে মামলা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। মামলা বিমান করবে নাকি মন্ত্রণালয় করবে, সেটা এখনও ঠিক হয়নি বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একজন অতিরিক্ত সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিগগিরই মামলা করা হবে, এটি চূড়ান্ত। তবে মামলায় কাকে কাকে আসামি করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে তিনটি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। যারা এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে, নাকি আরও কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রী দুয়েকদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন। মামলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাকি বিমান নাকি আমাদের মন্ত্রণালয় করবে, তা আলোচনা করে ঠিক করা হবে। তবে আমরা বিমানকে মামলা করতে বলব।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসাদ্দেক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলার বিষয়টি এখনও আমার জানা নেই। যাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। বিমান বিভাগীয় পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’
এর আগে রবিবার সকালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি মন্ত্রীর হাতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। বিকালে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সচিবালয়ে প্রেস বিফ্রিং করেন।
প্রেস বিফ্রিংয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ভিভিআইপি ফ্লাইটে নিরাপত্তায় ক্রটি লক্ষ্য করা গেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে অনেক লোক সেখানে ঘোরাফেরা করছে। এরা কারা, তারা কেন সেখানে ঘোরাফেরা করেছে, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না।’
তদন্তে এসওপিতে (স্ট্যান্ডিং অপারেটিং প্রোসিডিউর) ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যাদের যেখানে যে কাজগুলো করার কথা ছিল, চেক লিস্ট থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ে এগুলো করা হয়নি। এসওপিকে যুগোপযোগী করতে বলা হয়েছে।’
মেনন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজে ত্রুটির ঘটনা ‘মনুষ্যসৃষ্ট’। তবে এ ঘটনা ‘নাশকতা’ ছিল কিনা, তা জানতে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে উড়োজাহাজটির অয়েল প্রেশারে সমস্যা ছিল এবং এর নাট-বল্টু ঢিলা ছিল।’
মন্ত্রী বলেন, ‘এ ঘটনায় কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল। তবে ‘নাশকতার উদ্দেশ্যে’ গাফিলতি করা হয়েছিল কিনা তা তদন্তের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তিনটি কমিটি একই ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এ দুর্ঘটনা মনুষ্যসৃষ্ট ছিল।’
বিমানমন্ত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারেরও সদস্য। তাই তাকে বহনকারী উড়োজাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।এখানে অন্য কোনও ইস্যু কাজ করবে না।’
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘প্রতিবেদনে অনেক কিছুই আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হবে। উড়োজাহাজে যান্ত্রিক গোলযোগের ঘটনা তদন্তে গঠিত তিনটি কমিটির প্রতিবেদন সমন্বিত করে তা দুয়েকদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে অথবা তার কার্যালয়ে দেওয়া হবে। সেখানে (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) বসেই ঠিক করা হবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।’
তদন্ত প্রতিবেদনে নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন সুপারিশও রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে চারটি, বেবিচকের জন্য তিনটি এবং বিমানের জন্য ১০টি সুপারিশ রয়েছে। বিমানের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে। আইনানুগ প্রক্রিয়ায় কোনও গ্যাপ থাকুক, কোনও ধরনের সুযোগ তৈরি হোক সেটা আমরা চাচ্ছি না। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ২৭ নভেম্বর হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এ ঘটনা তদন্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকারের নেতৃত্বে পৃথক একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুই দফায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নয় জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।
- সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই ইসি গঠন করতে হবে: মির্জা ফখরুল
- খালেদার প্রস্তাবিত সার্চ কমিটির সদস্যদের নাম জানেন না বিএনপি নেতারা!
/টিআর/আপ-এমও/








