গত সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের টঙ্গীতে টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় নিহত আট শ্রমিকের লাশ এখনও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।তাদের ডিএনএ প্রতিবেদনের কী অবস্থা, সে বিষয়ে কোনও তথ্য নেই জেলা প্রশাসকের কাছে। এমনকি চার মাসেও আট লাশের ডিএনএ প্রতিবেদন না আসার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি এস এম আলম শুরুতে বিষয়টি মনে করতে পারেননি। সোমবার একজন অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী এ বিষয়ে ডিসির সঙ্গে দেখা করতে গেলে এরকমই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এদিকে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরও কিছু বলতে পারিনি। আমি জেলা পরিষদের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ নিহতদের স্বজনেরা বলছেন, চার মাসেও লাশ বুঝে পেলাম না, সবাই খালি ক্ষতিপূরণের গল্প দেয়। জেলা প্রশাসকের এধরনের আচরণে তারা আশাহত হয়েছেন বলেও জানান।
নিহত গার্মেন্টস শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কাজ করছেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন,আটটি পরিবার তাদের স্বজনদের লাশের অপেক্ষায় আছে চার মাস। আর দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি ফলোআপও করেননি বরং ভুলে গেছেন, এটা ভীষণ অগ্রহণযোগ্য ও অদায়িত্বশীল আচরণ।
টাম্পাকো দুঘর্টনার একমাস পর অক্টোবরে উদ্ধার অভিযান শেষে জেলা প্রশাসক নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘এক মাস ধরে চলা উদ্ধার অভিযানে ৩৯টি লাশ, কিছু হাড় ও শরীরের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ৩৬ জনকে আহতাবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অনেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। ৮টি লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। তাদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের মেশিন অপারেটর আনিসুর রহমানের (৩০) স্ত্রী শারমিন আক্তার শিল্পী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিভাবে মাসের পর মাস আমরা কাটাচ্ছি, তা কেউ বুঝবে না। ক্ষতিপূরণের কোনও ব্যবস্থা নেই। লাশটাও যদি না পাই। এভাবে দিনের পর দিন অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে। কবরের অধিকারও কি আমাদের নাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অপেক্ষা করছি। কবে এর শেষ হবে তা জানা নাই। দেশের বাড়িতে নিয়ে কবরের ব্যবস্থা করতে পারলে তার আত্মা অন্তত শান্তি পেত।’ তিনি বলেন, ‘শুনতে পেলাম উনি (জেলা প্রশাসক) নাকি ভুলেই গেছেন যে, আটটি লাশ এখনও মর্গে পড়ে আছে। এধরনের আচরণে আমরা খুবই হতাশ ।’
আটজনের লাশের বিষয়ে তাদের স্বজনদের বলা হয়েছে, আগামী ২০ জানুয়ারি পরিচয় জানা যাবে। এবিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে ডিএনএ অ্যানালিস্টদের পক্ষ থেকে এই তারিখ জানানো হয়েছে।তবে ওই তারিখেই লাশগুলোর পরিচয় জানা যাবে কিনা সেবিষয়ে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’ তিনি আরও জানান, ‘কয়েকটি ধাপে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ ডিএনএ পরীক্ষা করে থাকে। সবেমাত্র প্রাথমিক ধাপটি শেষ হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে পরিচয় শনাক্ত করা অনেকটাই সম্ভব হবে বলে তারা জানিয়েছে।’ ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক আর চূড়ান্ত কিভাবে হবে, কিংবা প্রাথমিক ফলাফলের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফল পার্থক্য তৈরি করে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি আসলেই বিষয়টা জানি না।’
সিআইডির চিফ ডিএনএ অ্যানালিস্ট আহমেদ ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেবল আটটি লাশের বিষয় এটি না। অনেক স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর প্রতিটার অ্যানালাইসিস ও প্রতিবেদনে সময় লাগারই কথা। তবে আমরা প্রথম অংশ আগামী ২০ জানুয়ারি জানিয়ে দিতে পারবো আশা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা লাশ নিয়ে গেছেন প্রাথমিক শনাক্তকরণের মধ্য দিয়ে তাদেরও স্যাম্পল অ্যানালাইসিস হচ্ছে। আমরা প্রতিবেদন লেখার কাজ শুরু করবো।’
উল্লেখ্য, গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীতে বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টাম্পাকো ফয়েলস কারখানা বিধ্বস্ত হয়। এতে মারা যান ৩৯ জন ও আহত হন ৪০ জন। এদের মধ্যে ডিএনএ টেস্টের জন্য ৯ জনের স্বজন রক্ত ও লালা দিয়েছিলেন গত ২১ সেপ্টেম্বর।
অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী সায়দিয়া গুলরুখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাড়ে চার মাস অনেক দিন। তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের সময় ডিএনএ পরীক্ষায় দুই মাস লেগেছিল। টাম্পাকোর নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর শুধু স্বজন হারানোর কষ্টই না, স্বজনদের লাশও পর্যন্ত পান নাই যে, দাফন করবেন ও দোয়া করবেন। আমরা সবাই ডিএনএ রিপোর্ট এর অপেক্ষায় আছি।’
/ইউআই /এপিএইচ/








