মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কারণে ফরিদপুর সদর হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য মহিবুর রহমানকে ঢাকায় আনার পরামর্শ দেন ফরিদপুরের চিকিৎসকরা। কিন্তু বাবাকে নিয়ে ঢাকায় রওনা দেওয়ার উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ করতে গিয়ে বিপদে পড়েন শাহীনুর রহমান। ফরিদপুরের কোনও অ্যাম্বুলেন্সকে ঢাকায় আসতে রাজী করাতে পারেননি তিনি। পরে প্রায় ২৮ হাজার টাকায় একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে বাবাকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পৌঁছান তিনি।
ঢাকার শান্তিনগরের আব্দুল জব্বারের কিশোরী কন্যা জবা আজ ভোরে বাথরুমের মেঝেতে পড়ে যায়। এতে তার বাম হাত ও বাম পা ভেঙে যায়। জবাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানিকে ফোন করেন আব্দুল জব্বার। কিন্তু কোনও অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানিই ট্রিপে বেরুতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে সিএনজিতে করে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন আব্দুল জব্বার।
আজ রবিবার নতুন বছরের প্রথম দিনেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঘুরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা রোগীদের এমন দুর্ভোগের চিত্রই চোখে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী যাতায়াতের চিত্র ঢামেক জরুরি বিভাগের সামনে নৈমিত্তিক। কিন্তু বছরের প্রথম দিনটিতে এসে জরুরি বিভাগের সামনে চোখে পড়েনি একটি অ্যাম্বুলেন্সও। রিক্সা, সিএনজি, ভ্যান আর ব্যক্তিগত গাড়িতে করেই রোগীদের আসতে দেখা গেছে হাসপাতালে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালই নয়, রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ প্রতিটি হাসপাতালেই চলছে রোগীদের ভোগান্তি আর দুর্ভোগ। আর এর কারণ হলো- দেশব্যাপী চলমান অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি রেজিস্ট্রার খাতাতেও দেখা গেছে, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ রোগীদের ভর্তির পরিমাণ কম। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঢামেক জরুরি বিভাগের ভর্তি কক্ষে উপস্থিত থাকার সময় খুব কম রোগীকেই ভর্তি হতে দেখা গেছে। এর কারণ হিসেবেও জরুরি বিভাগের কর্তব্যরতরা অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স না থাকাকেই দায়ী করেছেন।
এর আগে, গতকাল শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) রাত ১২টা থেকে অর্নিদিষ্টকালের জন্য সারাদেশে ধর্মঘট ডাকে ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স সমবায় সমিতি। এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে সব ধরনের অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতি। আর এ কারণেই সারাদেশের রোগীরা পড়েছেন বিপাকে। রাজধানী ঢাকার আশে-পাশের এলাকা থেকে সিএনজি যোগে হাসপাতালগুলোতে পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও দূরবর্তী স্থানগুলোর রোগীদের বাড়তি অনেক টাকা খরচ করে ঢাকায় আসতে হচ্ছে মাইক্রোবাস বা অন্যান্য গাড়ি ভাড়া করে।
যাত্রীদের এমন দুর্ভোগে সমবেদনা জানালেও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না বলে জানিয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স সমিতির নেতারা। ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স সমবায় সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন রবিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা রোগীদের ভোগান্তির বিষয়টি বুঝতে পারছি। এ জন্য আমরা সমব্যাথী ও সহমর্মী। কিন্তু আমাদের দাবি মেনে না নেওয়া হলে এ ধর্মঘট চলবে।’
আলমগীর হোসেন আরও বলেন, ‘গতকাল (৩১ ডিসেম্বর) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ধর্মঘট শিথিল করার অনুরোধ করেন। তার কথা মেনে নিয়ে আমরা মুমূর্ষু রোগীদের ক্ষেত্রে ছাড় দিচ্ছি। কিন্তু অন্যান্য রোগীদের নিয়ে কোনও অ্যাম্বুলেন্স আজ রাস্তায় নামেনি।’ সারাদেশের চিত্র একই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সারাদেশেই গতকাল রাত থেকে ধর্মঘট চলছে। জরুরি রোগীদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বের হলেও অন্যদের নিয়ে চলাচল করছে না। অ্যাম্বুলেন্স চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।’
কী কারণে সারাদেশে এই ধর্মঘট ডাকা হয়েছে জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মোট ছয়টি দাবি নিয়ে আমরা এই ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হয়েছি। তার মধ্যে অন্যতম হলো- রিআরটিএ থেকে অ্যাম্বুলেন্সকে রুট পারমিট দেওয়া হয় না। কিন্তু রাস্তায় বের হলেই সার্জেন্টরা রুট পারমিট চায়। গাড়ির আসন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মামলা ও হয়রানি করা হয় আমাদের। আবার বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অ্যাম্বুলেন্স সিএনজিতে রূপান্তর করার জন্য মামলা দেয়। রাস্তায় বের হলেই পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মামলা করা হয় আমাদের।’
আলমগীর বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সে নানা ধরনের রোগী থাকে। অনেক সময় সন্তানসম্ভবা নারী গাড়ির মধ্যেই সন্তান প্রসব করে ফেলেন। এসব ক্ষেত্রে গাড়িতে স্বচ্ছ গ্লাস থাকলে সেটা রোগীদের জন্য বিব্রতকর। এসব কারণে অ্যাম্বুলেন্সে কালো গ্লাস পেপারেরও প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেটা নিয়েও সার্জেন্টরা আমাদের হয়রানি করে। এমন নানা বিষয় নিয়ে আমরা ক্ষুব্ধ।’
ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স সমবায় সমিতির এই যুগ্ম সম্পাদক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছিলাম এভাবে। গত বছরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনার পর থেকে এ হয়রানি আরও বেড়ে গিয়েছে। এসব বিভিন্ন কারণে ৩১ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডেকেছি আমরা। রাস্তায় সার্জেন্টরা খুব খারাপ ব্যবহার করে, আবার নগদ টাকাও নিয়ে থাকে। এগুলোর প্রতিবাদেই আমাদের এ ধর্মঘট। বিআরটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সার্জেন্ট ও হাইওয়ে পুলিশদের অত্যাচারেই আমরা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।’
রোগীদের ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে আলমগীর বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স না পেলে রোগীরা ভোগান্তির শিকার হবে, সে সম্পর্কে আমরাও ওয়াকিবহাল। কিন্তু কিছু করার নেই। তারা এভাবে ভোগান্তিতে পড়ুক- এটা আমরাও চাই না। কিন্তু নিজেরাও আর এভাবে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে পারব না। আমরা রোগীদের ভোগান্তির জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পরিস্থিতি আজ আমাদের এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।’
আজ রবিরার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির বৈঠক রয়েছে জানিয়ে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আজ রাতে আমরা আট থেকে ১০ জনের একটি প্রতিনিধিদল মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসব। আমাদের দাবি তার কাছে উত্থাপন করব। যদি তিনি আমাদের দাবি মেনে নিয়ে সমাধানের আশ্বাস দেন তাহলেই কেবল ধর্মঘট প্রত্যাহার হবে।’
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
/টিআর/








