রাজধানীর দারুসসালাম এলাকায় মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) দুই সন্তানসহ মায়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মাকে ঘাতক না বলে, দারিদ্র্যকে ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন,পর পর এধরনের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দারিদ্র্য থেকে পারিবারিক কলহ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মা বাধ্য হয়ে সন্তানকে হত্যা করছেন। এই বাধ্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে মনোরোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনও মা চান না তার সন্তানকে অনিরাপদ রাখতে। তিনি যখন মানসিকভাবে অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়েন এবং আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেন, তখন কোনও না কোনোভাবে তিনি সন্তানদেরও আর রাখতে চান না। এর পেছনে তার ঘাতক সত্তা কাজ করে না।
দারুসসালামের ঘটনায় মায়ের লিখে যাওয়া চিরকুট থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্যই এই মর্মান্তিক ঘটনার বড় কারণ। এলাকাবাসী বলছেন, তাদের মধ্যে কখনও তেমন ঝগড়া-মারামারি দেখেননি তারা। তবে পরিবারে অভাব ছিল ষোল আনা। ফলে মনোমালিন্য ঘটে থাকতে পারে। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘শামীম, তোমার একটা ভুলের জন্য এত বড় ঘটনা।তুমি ভেবেছো আমি সুধু (শুধু) শুনব না। তুমি সবার কথা ভাবো, আমাদের কথা ভাবো। আমি সবাইকে ছেড়ে যাছি (যাচ্ছি)। থাকবো না, পৃথিবী ছেড়ে আর বলেছিলাম না। আমি যেখানে, ওরা সেখানে..।’
এর আগে গত ডিসেম্বরে ফেনীর শহরতলীর পশ্চিম উকিল পাড়ায় মা মর্জিনা আক্তার মুক্তাসহ (২৭) শিশু পুত্র মহিন মাহমুদ (৩) ও মেয়ে তাসলিম মাহমুদ মাহির (৮ -এর) মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ভূইয়া বাড়ির ইটালি প্রবাসী তারেক মাহমুদের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার মুক্তা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে প্রথমে সন্তানদের হত্যা করেন। পরে নিজে আত্মহত্যা করেন। মর্জিনা আক্তার মুক্তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পুত্র মহিন মাহমুদের গলায় ছিল তার প্যাঁচানো, আর মেয়ে তাসলিম মাহমুদ মাহির গলায় ছিল গামছা প্যাঁচানো ছিল।
এলাকাবাসী জানায়,প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে কিছুদিন ধরে স্ত্রী মর্জিনা আক্তার মুক্তার ফোনে তর্ক চলছিল।
২০১৫ সালে চট্টগ্রামে দুই শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যার পর নিজের গলায় ধারালো ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন রেহানা আক্তার (৩০) নামে এক মা। এ ঘটনায় মা বেঁচে গেলেও নিহত হয় তার দুই শিশু সন্তান মরিয়ম সুলতানা (৭) ও মো. ইয়াসিন (২)। রেহানার স্বামী মো. হুমায়ুন পেশায় রিকশাচালক । তিনি স্থানীয় বাজারে রাতে নৈশ প্রহরীরও কাজ করতেন। ভোর চারটার দিকে রেহানার স্বামী হুমায়ুন নৈশ প্রহরীর ডিউটি শেষে ঘরে ফিরে এ অবস্থা দেখে এলাকার মানুষকে খবর দেন।
এবিষয়ে মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবা-মা কখনও সন্তানের খারাপ চান না। সেখানে একজন মা যখন সন্তানকে হত্যা করেন,তখন সেটা অবশ্যই স্বাভাবিক ঘটনা না।যেকোনও আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যাবে, যারা আত্মহত্যা করছেন তারা কোনও না কোনও চাপে বা অশান্তিতে ছিলেন ।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় মরে যাওয়ার চিন্তা আসতে পারে। যদি তার সন্তান থাকে তিনি তখন সমস্যার সমাধান চান। এবং গণমাধ্যমে যখন তিনি দেখেন সন্তান হত্যা করে আত্মহত্যা করা যায়, সেটাতে তিনি উৎসাহিত বোধ করেন। ফলে গণমাধ্যমকে আমরা এধরনের সংবাদ প্রকাশে উৎসাহিত করতে চাই না।’ মেখলা মনে করেন, ‘সমস্যাতো থাকেই, কিন্তু ব্যক্তিত্বে ধারণের যে সক্ষমতা তাতে কমতি থাকলে, তিনি সমাধানের রাস্তা আত্মহত্যা দিয়ে খোঁজেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আত্মহত্যা করেন বা করার কথা ভাবেন, তারা এক ধরনের মানসিক অশান্তির মধ্য দিয়ে যান।তাদের সবারই মনোচিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া উচিত। যদি একবারও তারা এই সহায়তা নেন, তাহলে এধরনের ঘটনার সম্ভাবনা কমে আসবে। তার আশেপাশের মানুষদের এদিকে নজর দিতে হবে।’
অপরাধ বিশ্লেষক ড. জিয়া রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই মা তার সন্তানদের মানুষ করেছেন। তিনি সুস্থ অবস্থায় থাকলে এই সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে হত্যা করতে পারতেন না। ফলে হত্যার একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, সেটি ভুলে গেলে চলবে না।’ তিনি বলেন, ‘পারিবারিক দারিদ্র একটি বড় বিষয়। কিন্তু পারস্পারিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে সেটির মধ্যেই মানুষ বসবাস করে। যদি পারস্পারিক বোঝাপড়ায় কমতি হয় তখন এই অসম্ভব কাজটিও সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এখানে একজন মা-কে ঘাতক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘাতক হয়ে ওঠার পেছনের যে কারণগুলো, সেটিকেই লক্ষ্য করে সামাজিক সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।’
/ইউআই /এপিএইচ/
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতিকে চারটি প্রস্তাব ও ১১টি সুপারিশ দিলো আ.লীগ








