বইমেলায় প্রকাশিত কোনও বইয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির কোনও বিষয় আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখবে পুলিশ। বিষয়টি বিশেষ কোনও কমিটি বা বাংলা একাডেমি দেখবে না। এমনটিই জানিয়েছেন বাংলা একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেন। যদিও মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান শুরু থেকেই এ ধরনের কোনও নজরদারির বিষয়ে একাডেমি কিছু জানে না বলে দাবি করে আসছেন। তিনি বলছেন, ‘মনিটরিংয়ের বিষয়টি নতুন কিছু নয়, বরাবরই ছিল। তবে পুলিশ নজরদারি করবে, এমন কিছু আমি শুনিনি।’
এদিকে, বইয়ের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির ঘোষণাকে ‘অযথা ভীতিসঞ্চারক’ বলে উল্লেখ করছেন প্রকাশকরা।
‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের’ অভিযোগে গত বছর বইমেলায় ব-দ্বীপ প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেয় পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় প্রকাশনীর মালিক শামসুজ্জোহা মানিক, কর্মকর্তা ফকির তসলিম উদ্দিন কাজল ও শামসুল আলম চঞ্চলকে। তারও আগে অভিযোগ তুলে রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত দুই বছরের এই টালমাটাল পরিস্থিতি প্রকাশক ও লেখকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতির জন্ম দিয়েছে। লেখকরা বলছেন, মগজে শুরু থেকেই সেল্ফ সেন্সরশিপ কখনও সৃজনশীল কিছু তৈরিতে সহায়ক হতে পারে না। একই ধারাবাহিকতায় গত ২২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত একাডেমির কাউন্সিল ঐক্য প্রকাশনী, নীলপরী প্রকাশনী, রঙিনফুল প্রকাশনী ও ব-দ্বীপ প্রকাশনীর বিরুদ্ধে পাইরেটেড বই বিক্রির অভিযোগ এনে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও এবারের বইমেলায় নতুন করে পুলিশি নজরদারি মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে ব্যাহত করবে কিনা, এমন প্রশ্নে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ বইয়ের ওপর নজরদারি করবে বা মনিটর করবে কিনা, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এমন কোনও সিদ্ধান্ত বাংলা একাডেমি নেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রবিরোধী কোনও কিছু প্রচার হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তেমন কিছুর ক্ষেত্রে নতুন ঘোষণার বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। তবে, বাংলা একাডেমির মেলা পরিচালনা কমিটি এ ধরনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।’ এক্ষেত্রে লেখক-প্রকাশককে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
যদিও মঙ্গলবার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলাকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মুক্তচিন্তা ও নিরাপত্তা দুটিকে মিলিয়ে ফেললে হবে না। আমরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। কিন্তু মুক্তচিন্তা করতে গিয়ে আপনি যদি কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেন ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গা সৃষ্টিতে উস্কানি দেন তাহলে সেটা মুক্তচিন্তার মধ্যে পড়ে না।’
গোয়েন্দারা পুরো প্রক্রিয়াটিতে সক্রিয় থাকবেন বলে ডিএমপি কমিশনার জানালেও একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, ‘একাডেমি এ বিষয়ে কিছু জানে না।’ যদিও বাংলা একাডেমির সচিব বিষয়টির সত্যতা উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা কোনও আলাদা প্যানেল করব না, যা করার পুলিশ করবে। রাষ্ট্রবিরোধী কোনও বিষয় প্রকাশ প্রচারিত হচ্ছে কিনা, সেটি পুলিশ দেখবে, ব্যবস্থাও পুলিশ নেবে। এতে আমাদের করণীয় তেমন কিছু নেই। কারণ এটি আইনি বিষয় এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাই সেটা করবে।’ মহাপরিচালক কিছু জানেন না দাবি করলেও সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে পুলিশ নজরদারির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনায় রাখছে। দায়িত্বশীল পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশের বিশেষ শাখা একটি দল তৈরি করবে। যাদের লেখা দেখা দরকার মনে হবে সেগুলো দেখা হবে।’ কোনও বই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া পুলিশের কাজ কিনা, এমন প্রশ্নে বাংলা একাডেমির সচিব বলেন, ‘দণ্ডবিধি অনুযায়ী যেটা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে মনে করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।’
আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্যানিক সৃষ্টি করবে। তা মেলার পরিবেশের জন্য ভালো নয়।’ তিনি বলেন, ‘যদি কোনও বইতে তেমন কিছু তাদের মনে হয়, প্রকাশককে বইটি প্রত্যাহারের কথা জানাতে পারে। গ্রেফতার বা স্টল বন্ধ কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়টিকে অস্পষ্ট ও আপেক্ষিক ধারণা উল্লেখ করে শ্রাবণ প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লেখক প্রকাশকের বই বাংলা একাডেমি নিজে মনিটরিং করে থাকে, সেটি পুলিশকে কেন এবার ঘোষণা করতে হলো, সেটা বোধগম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘‘এর আগেও নানাভাবে মুক্তচিন্তাকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য কোন ক্ষমতাবলে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বিবেচনা করবেন মেলার আগেই সেটি স্পষ্ট না করলে বিপদ।’’
তবে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটাতো হয়েই আসছে নানা পদ্ধতিতে। প্রকাশক হিসেবে কী ছাপছেন, সেই দায় আছে।’ কেউ যা তা লিখলেই ছাপতে হবে কেন প্রশ্ন করে এই প্রকাশক বলেন, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ধর্মবিদ্বেষী বই লেখা বা প্রকাশ থেকে বিরত থাকা উচিত।’
আরও পড়ুন: বইয়ের রয়্যালটির টাকা কোথায় যায়?
/এমএনএইচ/








