১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পাকিস্তানি বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে ড. শামসুজ্জোহাকে। এরপর থেকে রাবি কর্তৃপক্ষ ১৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ ড. জোহা দিবস পালন করে আসছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে এখনও এ দিবসের স্বীকৃতি মেলেনি।
১৯৭০ সালে প্রকাশিত আনিসুর রহমান সম্পাদিত ‘তিমির হননে’ শীর্ষক প্রকশনায় প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় পাওয়া যায়, কিভাবে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয় ড. জোহাকে।
প্রকাশনাটিতে মুহম্মদ আবদুল খালেক একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার প্রতিবাদে ১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তাল হয়ে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ছাত্ররা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বের হলে ভিসির সঙ্গে জরুরি বৈঠক ফেলে ছুটে যান ড. জোহা। ছাত্রদের বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনেন। তাতেই বিপত্তি ঘটে। প্রশাসন মনে করে, যে ব্যক্তি এক ডাকে ফেরাতে পারে সেই হয়তো তাদের রাস্তায় নামিয়েছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সেদিন তার কথা কাটাকাটিও হয়। সেই মিছিলে আহত ছাত্রদের তিনি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেইদিনই রাত ১০টায় শহীদ মিনারে প্রতিবাদ সভায় ড. জোহা বলেন, ‘…শুধু ছাত্ররা নয়, আমরা সবাই মিলে এই দানবীয় শক্তিকে রুখে দাড়াবো, মরতে যদি হয় আমরা সবাই মরবো।’
পরেরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে রাবি প্রধান ফটকের কাছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ। এ সময় সেনারা শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালাতে উদ্যত হলে সে সময়ের প্রক্টর ড. জোহা বলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার আমার ছাত্ররা এখনই চলে যাবে এখান থেকে।’
অনুরোধ উপেক্ষা করে লেফটেনেন্ট বলেন, ‘ফায়ার অ্যান্ড কিল দেম’। গুলি চালাতে গেলে ড. জোহা নিজে এগিয়ে যান। তখন তার ওপরই গুলি চালায় সেনারা।
সেসময় আহত হন আরও দুজন শিক্ষক ড. মোল্লা ও মুহম্মদ আবদুল খালেক। এক বছর পর বের হওয়া স্মরণিকায় মুহম্মদ আবদুল খালেক লেখেন, ‘ড. মোল্লা ও আমার অবস্থা জানতেই তিনি যখন ছুটে আসছিলেন সেই মুহূর্তে তাকে বেয়নেট চার্জ করা হয়। রক্তে তার জামা ভিজে গেছে, জওয়ানদের হাতে আমি বন্দি।..জওয়ানরা আমাকে হিড়হিড় করে মিলিটারি ভ্যানে তুলে ফেললো। আমি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডেকে চিৎকার করে বললাম ড. জোহা মারা যাচ্ছেন, তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহার আত্মোৎসর্গের দিনকে জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণার দাবি জানিয়েছে রাবি শিক্ষক সমিতি। গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে প্রাণ উৎসর্গ করা এই মহান শিক্ষককে একুশে পদকে ভূষিত করারও দাবি তোলা হয়েছে।
কেন এতদিনেও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি প্রশ্নে রাবির সাবেক জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ও জোহার স্মৃতি সংগ্রহকারী আহমেদ শফি উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসু বা হল সংসদ নেই। তাছাড়া বর্তমান শিক্ষকদের আদর্শহীনতাও খানিকটা দায়ী। এখন অনেক কিছুই হয়ে গেছে দায়সারা। তিনি মনে করেন দিনটিকে কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন না করে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতীয়ভাবে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা উচিত।’
রাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. শাহ্ আজম শান্তনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ড. জোহার ইতিহাস কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ। এমনকি অনেকে ১৯৬৯ এর ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ঘটেছিল তা জানেনই না। ১৮ ফেব্রুয়ারিকে ড. জোহাকে স্মরণে জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণা করা হোক।’
তিনি জানান, দিবসটিকে জাতীয়ভাবে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রকাশনার ছবি: আহমেদ শফি উদ্দিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে
/এসটি/








