তিন চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি)— অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান; সব দলের আস্থা অর্জন করা এবং সরকারি দলের প্রভাবমুক্ত থাকা। চ্যালেঞ্জ তিনটিকে বিবেচনায় রেখেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে পথ চলতে শুরু করেছে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন এই কমিশন। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ইসি সবকিছু গুছিয়ে আনতে শুরু করেছে। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। কমিশন প্রত্যাশা করছে, তাদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিগগিরই সবার আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে ইসি।
এর আগের ইসি নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা থাকায় নতুন ইসির দায়িত্ব গ্রহণকে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দায়িত্ব নেওয়ার পর দলীয়ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি পৌরসভা ও পরে তিনটি উপজেলা পরিষদের সাধারণ নির্বাচন এবং ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভার উপ-নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হয়েছে এ কমিশন।
কমিশনের এই শুরুটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে নির্বাচন বিশ্লেষকেরা। তবে জনগণ ও রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জনে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে (কুসিক) বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে ইসির প্রতি আস্থার জায়গাটি বৃদ্ধি পাবে বলে মত তাদের। কমিশনও কুসিক নির্বাচনকে নিজেদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ মনে করছে। গত ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে এ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন— মাহাবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী। দায়িত্ব নিয়েই তারা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিগত কমিশনের নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি নুরুল হুদা বলেন, ‘অনেকেই বলেছেন যে ইনক্লুসিভ নির্বাচন ছিল না বলেই ইসি বিতর্কিত ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক না হলে এবং সব দলের অংশগ্রহণ না থাকলে নির্বাচন বিতর্কিত হবেই। আমরা আশা করব, সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে।’ পরদিন ইসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিতি সভায়ও নতুন ইসির চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করেন সিইসি।
এর মধ্যে সোমবার (১৩ মার্চ) চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, ‘দেশের মানুষ যেন স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, আমরা সেই ধরনের পরিবেশ তৈরি করছি। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। আমরা দল-মত নির্বিশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করব।’
সবার আস্থা অর্জনের প্রসঙ্গ টেনে কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সামনে আরও কিছু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন আমরা নির্বাচনমুখী পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছি। আমার বিশ্বাস, এসব পদক্ষেপ আমাদের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।’ পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে জোর আশ্বাস দেন তিনি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমান কমিশন নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে বদ্ধপরিকর। বলতে পারেন, কমিশন এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে সিইসির বক্তব্য তুলে ধরে ইসি সচিব বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সিইসি বলেছিলেন, ইসির প্রতি সবার যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, সেই অবস্থার বদল করে ইসির প্রতি সবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। তিনি আরও বলেছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশন কারও দ্বারা প্রভাবিত হবে না।’
কমিশনের এক মাসের কার্যক্রম তুলে ধরে ইসি মুখপাত্র আব্দুল্লাহ বলেন, ‘এই সময়ের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু নির্বাচন হয়েছে, যেগুলো নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। আমি মনে করি, এর মাধ্যমে কমিশনের প্রতি সবার আস্থার জায়গা তৈরি হবে। আশা করি, কুসিক নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের মধ্য দিয়ে কমিশনের প্রতি সবার ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।’
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুদমার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিগত ইসির কর্মকাণ্ডে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের চরম আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ওই ইসি বলতে গেলে নিয়োগকর্তাদের তুষ্ট করতেই ব্যস্ত ছিল। এখান থেকে এই কমিশনকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
বদিউল আলম বলেন, ‘কমিশনের শুরুটা মোটামুটি ভালো বলা যেতে পারে। তবে এটা দিয়ে সার্বিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। আসন্ন কুসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিশনকে মূল্যায়নের একটি জায়গা তৈরি হবে বলে মনে করি।’
/টিআর/আপ-এসটি








