অভিযান শেষে জঙ্গি আস্তানাগুলো ঘৃণা-ভয়-ক্ষোভের বাড়ি!

উদিসা ইসলাম
০২ এপ্রিল ২০১৭, ১৩:২১আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৭, ১৩:৫২

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা ‘জাহাজ বিল্ডিং’

গুলশানে হলি আর্টিজানের ঘটনার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে জঙ্গি নিহতের ঘটনা ঘটেছে, সে বাড়িগুলো এখন যেন মৃত্যুপুরী।এসব বাড়িতে কেউ বসবাস করে না। অভিযানে জঙ্গিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র খুঁজে পাওয়া গেছে বা জঙ্গি নিধন হয়েছে যেসব ভবনে, সেসব বাড়ি আর ভাড়াও নেয়নি কেউ। এমনকি বাড়ির মালিক সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনও কথা বলতেও রাজি নন।এসব বাড়ি ঘিরে আশেপাশের মানুষের কেবলই ঘৃণা-ভয় আর ক্ষোভ।

গাজীপুরের একটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান

২০১৬ সালে একের পর এক রাজধানীর গুলশান, কল্যাণপুর, মিরপুরের রূপনগর, আজিমপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের পাতারটেক, টাঙ্গাইল ও সাভারের আশুলিয়া এবং সর্বশেষ দক্ষিণখানের আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টোরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।অভিযান শেষে একটি বাড়িও আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

এলাকাবাসী বলছে, একেকটা এলাকায় এই বাড়িগুলো ঘা হয়ে থাকবে। সামনে দিয়ে আসা- যাওয়ার সময় ভাবি, কী ভয়ঙ্কর কিছুইনা ঘটাতে পারতো এই জঙ্গিরা।

আতিয়া মহলের বর্তমান অবস্থা

কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের ৫৩ নম্বর বাড়ি তাজ মঞ্জিলের (জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত) ছয়তলা ভবন। ২৬ জুলাই এই জনবহুল এলাকায় রাতভর অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক ঘণ্টার অভিযানে নয়জন জঙ্গি নিহত ও একজন আহত হয়। সে রাতের অভিযানের পর বাড়িটি তেমনই পড়ে আছে। বাইরে তালা ঝুলছে, ভেতরে কোনও ভাড়াটিয়া নেই।

স্থানীয় দোকানিরা বলছেন, টহল পুলিশ আসে মাঝেমধ্যে।ওই ঘটনার পর কোনোদিন ভেতরে কেউ ঢোকেনি। এই এলাকায় এমন একটি আস্তানা ছিল এবং জঙ্গিরা থাকতো এটা ভেবেই পাশের বাসার লোকজন এখনও ভয়ে সিঁটিয়ে থাকেন। জাহাজবাড়ির বাড়ির পাশের দোকানদার  হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনতো মনে হয় কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারবো না। কোথায় কে কোন মতলবে আছে? চোখের সামনে এই বাড়ি দেখে ভয় লাগে। মাঝে মাঝে বাড়িটার দিকে তাকালে অজানা ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে।’

শেওড়াপাড়ার জঙ্গি আস্তানার ছবি

পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৪৪১/৮ নম্বর বাড়ি। গতবছর ১৭ জুলাই রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় গুলশান হামলায় জড়িত জঙ্গিদের আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। অভিযানে বাড়িটিতে থেকে জঙ্গি না পেলেও হাতে তৈরি গ্রেনেড ও কালো পোশাক উদ্ধার করা হয়। বাড়িটির ঠিক পাশেই একটি কিন্ডারগার্টেন। সেখানে শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলছেন, ঘটনার পর ওই বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটা চলা করতেও গা কাঁপে। এখন একটু সয়ে গেছে। কিন্তু বাড়িটির দিকে তাকালে এখনও অবাক লাগে, আমাদের আশেপাশেই এরা বাস করছে। প্রতিটি ঘটনাতেই বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা সচেতন ছিলেন না। কোনও না কোনও কৌশলে ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি দেখেছি আমরা। এখনতো ভাড়াটে হিসেবে আমি হীনমন্যতায় ভুগি।

গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাড়ির পাঁচতলাতে ভাড়া থাকতো নব্য জেএমবির সামরিক প্রশিক্ষক মেজর জাহিদ ওরফে মুরাদ। জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার  সময় জঙ্গি মুরাদ পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে পালাতে থাকে। পরে পুলিশের গুলিতে সে নিহত হয়।
আতিয়া মহল, বড়হাট, নাসিরপুর ও কুমিল্লার চার জঙ্গি আস্তানা:

সিলেটের আতিয়া মহল, মৌলভীবাজারের পৌর এলাকার বড়হাট ও নাসিরপুরের একটি বাড়িতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের রক্তাক্ত দাগ এখনও শুকায়নি। একই অবস্থা কুমিল্লার কোটবাড়ীর একটি বাড়িরও। যদিও সেখানে শেষ পর্যন্ত কোনও জঙ্গির দেখা পায়নি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।

মৌলভীবাজারের বড়হাটের জঙ্গি আস্তানা

সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু হয় গত ২৪ মার্চ। সেদিন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটি ঘিরে ফেলে স্থানীয় পুলিশ। এরপর সিটিটিসির সোয়াট টিম ২৫ মার্চ সেখানে পৌঁছালেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাড়িটিতে বিকাল থেকে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোরা। টানা চারদিনের অভিযানে সেখানে নারীসহ চার জঙ্গি নিহত হয়। পাঁচতলা বাড়িটিতে উভয়পক্ষে এত পরিমাণ গোলাবারুদ ও বিস্ফোরকের ব্যবহার করা হয়েছে যে এর কাঠামোর দিকেও তাকানো যায় না। এখনও বোমা ও গোলা বারুদ পরিষ্কার না হওয়ায় বাড়িটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি তার মালিককে, যেতে দেওয়া হয়নি ভাড়াটিয়াদের। বাড়িটিকে ঘিরে সিলেটজুড়ে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানা দুটিতেও টানা দুদিন ধরে অভিযান চালায় সোয়াট বাহিনী।এসব আস্তানায় অভিযান শেষ হলেও এখনও তা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ বাড়ি দুটোতেও বিপুল পরিমাণ গোলা বারুদ ও বিস্ফোরকের ব্যবহার হয়েছে দু’পক্ষে। এ দুটো বাড়িকে ঘিরেও মৌলভীবাজারের ওইসব এলাকার মানুষ রয়েছে ভয়ে আর আতঙ্কে। অনুরূপ কুমিল্লার জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে অভিযান চালানো বাড়িটিতেও গুলি ও বিস্ফোরকের ব্যবহার হয়েছে, সে বাড়িটিও এখন হতশ্রী চেহারায় ভড়কে দিচ্ছে এলাকাবাসীকে।

বাড়ির মালিকরা এখন বাড়ি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছেন চরম বেকায়দায়। ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র জমা নেওয়ার শর্ত পূরণ করেও তারা নিরাপদ বোধ করছেন না, কারণ, ফরমে ভুল পরিচয় ও তথ্য দেওয়া এবং জাল জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা পাওয়া গেছে একাধিক জঙ্গি আস্তানায়। অন্যদিকে, জঙ্গি আস্তানাতে তো নয়ই, বরং এর আশেপাশের এলাকাতেও বাসা ভাড়া নিতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ ভাড়াটিয়ারাও।

বড়হাটের জঙ্গি আস্তানার পেছনভাগ

এসব বিষয় নিয়ে মানবাধিকার কর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব বাসায় জঙ্গি ছিল, কিংবা জঙ্গিদের হত্যা করা হয়েছে, সেসব বাসায় নতুন করে বসবাসের সম্ভাবনাই থাকার কথা না। কিন্তু অন্যান্য ফ্লোর বা ফ্ল্যাটে কেউ থাকতে চাইলেও সেক্ষেত্রে পুলিশের মামলা ও বিভিন্ন প্রক্রিয়া থাকে। ফলে বাড়িগুলো নিয়ে এলাকায় নানা গল্প ও  শঙ্কা তৈরি হয়। এলাকার মানুষের মধ্যে, জনবসতির মধ্যে এধরনের অভিযান হলে বাড়িটি নিয়ে করণীয় নির্ধারণ জরুরি। তা না হলে জঙ্গিদের কার্যকলাপ নিয়ে কথা অব্যাহত থাকবে। সেটা কাজের কথা নয়।’

নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানা

মৌলভীবাজারের নাসিরপুর ও বড়হাটের দুটি আস্তানার বাড়িওয়ালা লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমান। আস্তানায় অভিযান শুরুর পর বাড়িওয়ালার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

এদিকে, মৌলভীবাজারের বড়হাটে শনিবার অভিযান শেষে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম আবারও বাড়িওয়ালা ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাড়িওয়ালা ও জনগণ যদি এগিয়ে আসেন তাহলে এ সমস্ত  ধর্মবিরোধী, দেশবিরোধী ও মানবতাবিরোধী জঙ্গিদের দমন করা কঠিন হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িওয়ালা যদি সতর্ক হন, সাধারণ মানুষ যদি সতর্ক হন,  তারা যদি আশেপাশে খোঁজখবর রাখেন তাহলে এসমস্ত ঘটনা ঘটবে না।’

/ইউআই/ এপিএইচ/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম