জন্মের পর থেকে ছেলেকে নিয়ে যুদ্ধ করছি, ভেবেছি বড় হলে যুদ্ধ কমে যাবে। কিন্তু ভুল ভেবেছি, যত বড় হচ্ছে, আমাদের যুদ্ধ ততোই বেড়ে যাচ্ছে আর কঠিন হচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র থাকে, মনে থাকে সাহস আর থাকে রণকৌশল।স্কুল থেকে বলা হয়, ছেলে গোলমাল করে, আপনার এক ছেলের জন্য ক্লাসের অন্য ছেলেদের ক্ষতি হয়, আপনি ছেলেকে নিয়ে যান।কিন্তু আমাদের কিছুই নাই, কেবল সাহস সঞ্চয় করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, আমাদের যুদ্ধ কেউ বুঝবে না, বাংলা ট্রিবিউনকে এভাবেই বলছিলেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু অনুপমের বাবা পরিমল দাস।
কেবল পরিমল দাস নন, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এসব শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে অভিভাবকরা বলছেন, বর্তমান সরকার অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করছে, প্রধানমন্ত্রী কন্যা অটিস্টিক শিশুদের বিশেষভাবে আগ্রহী অথচ সাধারণ স্কুলগুলোতে বাচ্চাগুলোকে ভর্তি করাতে পারি না, স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয়, ক্লাস না করে কেবল পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পত্রে আমাদের বন্ডসই নিয়ে শর্তসাপেক্ষে ভর্তি করানো হয়। সাদা চোখে যতোটা যুদ্ধ করতে হয় বলে সবাই দেখতে পায় যুদ্ধটা আমাদের তারচেয়েও অনেক গুণ বেশি।
ছোটবেলায় চিকিৎসকের পরামর্শেই ছেলেকে মূলধারার স্কুলে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকেরা অনুপমের ডিজঅ্যাবিলিটিকে খুব মাইল্ড বলেই বলেছিলেন।সে এখন অনেক স্বাভাবিক।ধানমণ্ডি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা এবং নিউ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়ে পাস করে। এরপরই তাকে ভর্তি করা হয় মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত আদর্শ হাই স্কুলে। সে এখন দশম শ্রেণিতে পড়ছে। কিন্তু দশম শ্রেণিতে আসা পর্যন্ত অনুপম এবং তার পরিবারকে পাড়ি দিতে হয়েছে এক অনেক বন্ধুর পথ। অনুপমের বাবা পরিমল দাস বলেন, গত বছর জুন মাস থেকেই অনুপমকে স্কুলে আর না পাঠাতে বলেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক।ছেলে গোলমাল করে, ক্লাসে শিক্ষকদের এমন এমন প্রশ্ন করে যে, তারা উত্তর দিতে পারেন না জানিয়ে বাবা পরিমলকে বলা হয়, আপনার এক ছেলের জন্য ক্লাসের অন্য ছেলেদের ক্ষতি হয়, আপনি ছেলেকে নিয়ে যান। পরে অনেক কষ্ট করে ছেলেকে স্কুলে রাখা হলেও চলতি বছরে অনুপম তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয় আর তাতে যেন শক্তি হয় স্কুল কর্তৃপক্ষের। অথচ অনুপমের চেয়েও বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য ছেলেদের প্রমোশন দেওয়া হলেও প্রমোশন হয়না অনুপমের। এবারও অনেক চেষ্টা তদবির করে দশম শ্রেণিতে নেওয়া হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে বন্ড সই নিয়েছে যেখানে লেখা,‘তার মানসিক ভারসাম্য নাই, এখানে সে ক্লাস করবে না কেবল পরীক্ষা দেবে।’ অনুপম এখনও ক্লাস করছে না, তাকে ক্লাস করতে দেওয়া হচ্ছে না। এখনও আমরা মুক্ত হইনি, তবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। কতো আর যুদ্ধ করবো ছেলেকে নিয়ে।
গত ২১ বছর ধরে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আরেক মা ড্যানি রহমান। তার অটিজম আক্রান্ত ছেলে সিয়ামুল করিমকে লেখাপড়া শেখাতে গিয়েই সময়ে সময়ে এমন অনেক কথা শুনতে হয়েছে যে ড্যানি রহমান নীরবে চোখের জল ফেলতেন। ড্যানি রহমান বর্তমানে প্যারেন্টস ফোরাম ফর ডিফরেন্টলি অ্যাবল সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট।সন্তানকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি জোটবদ্ধ করেন অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের। এসব শিশু এবং তাদের বাবা-মায়ের জন্যই এই সংগঠন। ছেলেকে নিয়ে নিজের যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিয়ামকে নিয়ে স্কুলের যুদ্ধটা ছিল অনেক বেশি। ঢাকার অন্তত ত্রিশটি স্কুলে গিয়েছি তাকে ভর্তি করাতে, কেউ নেয়নি, তারা বলতো, এটা তো অটিস্টিকদের জন্য স্কুল না, এখানে কেন এনেছেন, তারা এমন কথাও বলতো চোখের পানি ধরে রাখতে পারতাম না। তবে আজ আমি আমার ছেলেকে নিয়ে গর্ববোধ করি, যে কিনা এখন তিনটি ভাষায় কথা বলতে পারে, ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে পরীক্ষা দেবে আর ভোকেশন্যাল ট্রেনিং সেন্টারে অফিস অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে, অটিজমে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে কোনও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে কীনা প্রশ্নে কেবল এক মায়ের কান্নাই দেখতে হলো কয়েক মিনিট।একসময় নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেন, এসব ছেলেমেয়েদেরতো কোনও দোষ নেই, তাদেরকে সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতেই পাঠিয়েছেন এভাবে। তাহলে মানুষ কেন স্রষ্টার আরেক সৃষ্টিকে এভাবে অবহেলা করে। তিনি বলেন, ছেলেটাকে নিয়ে স্কুলে স্কুলে ঘুরতে গিয়ে কেবল এটুকু বুঝেছি, আমাদের বন্ধু কেবল অটিস্টিক বাচ্চাদের বাবা-মায়েরাই হতে পারে, যার পরিবারে এমন কেউ নেই তারা বুঝবে না, কীভাবে আমাদের দিন কাটে আর কীভাবে রাত। বছরগুলো কতোগুলো দীর্ঘশ্বাসে শেষ হয় সে কেবল আমরাই জানি।
/টিএন/
এ সংক্রান্ত আগের স্টোরি: আমার এ সন্তানকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো?








