যুবসমাজসহ কোনও ব্যক্তি যেন অহেতুক জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ইসলাম ধর্মের মূল বাণীর ক্ষতি না করে সেজন্য তাদের যথাযথভাবে শিক্ষিত করার জন্য দেশের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও ওলামায়ে ইকরামদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ওলামা মাশায়েখ মহাসম্মেলনে তিনি বলেন, ‘মসজিদের ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষক, সব অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পবিত্র ধর্ম ইসলাম যে শান্তির বাণী শোনায়, ইসলাম যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, সেটি তুলে ধরবেন।’
শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আজ যারা এখানে বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও ওলামায়ে ইকরাম এসেছেন, তারা সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মূল্যবান বক্তব্য শুনে গেলেন। সমাজের ওলামা-মাশায়েখ ও অবিভাবকসহ সবাই ইসলাম যে পবিত্র ধর্ম, শান্তির ধর্ম, এই বার্তা পৌঁছে দেবেন সবার কাছে। আমরা চাই আপনারা স্ব স্ব এলাকায় জনগণের কাছে ইসলামের মূল বাণী পৌছে দেবেন। আপনারা অন্যদের শিক্ষা দেবেন যেন কেউই অহেতুক জঙ্গিবাদে জড়িয়ে এই ধর্মের মূল বাণীর ক্ষতি না করে। আপনাদের আহ্বান জানাই, ইসলাম ধর্ম যে প্রকৃত ধর্ম, শান্তির ধর্ম; এমন শিক্ষা দিন যেন কেউ ভুল পথে না যেতে পারে।’
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানেই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে আপনারা ব্যবস্থা নেবেন। ইতোমধ্যে আপনারা বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এজন্যে আপনাদের প্রতি কৃজ্ঞতা জানাই। ইসলাম ধর্ম পবিত্র ধর্ম। কেউ যেন এই ধর্মকে হেয় বা কলুষিত করে কথা বলতে না পারে এজন্য আমাদের সোচ্চার হতে হবে। আমাদের পবিত্র ধর্মের সম্মান যেন কেউ ক্ষুণ্ন করতে না পারে।’
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ শুধু আমাদের দেশের নয়, এটা সারাবিশ্বের সমস্য। আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যেখানেই যাই না কেন, যখন আমাদের ইসলাম ধর্মের সঙ্গে জঙ্গিবাদ শব্দ ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করি। তাদের স্পষ্টভাবে বলে দেই, কয়েকটা মানুষের জন্য আমাদের ধর্মপ্রাণ মানুষকে এভাবে হেয় করা যাবে না।’
একটি মহল থেকে ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করার চক্রান্ত চলছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা অস্ত্র তৈরি ও বিক্রি করে লাভবান হয়, তারাই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে লাভবান হয়। কিন্তু এই লাভ কার জন্য? মুসলমানরা মুসলমানদের রক্ত ঝরাচ্ছে, হত্যা করছে। মুসলমানদের রক্তের বিনিময়ে অন্যরা লাভবান হচ্ছে, এটা কেমন কথা।’
এদিন বিকাল ৩টার দিকে মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, ‘অতিথিরা তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম, সৌহার্দ্যের ধর্ম, মানবতার ধর্ম, শান্তির ও ভ্রাতৃত্বের ধর্ম। উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার ধর্ম। ইসলাম মানবতাবাদের ধর্ম। ইসলাম কখনও নিরীহ মানুষকে হত্যায় বিশ্বাস করে না। ইসলাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে স্থান দেয় না। অথচ ইসলামের কথা বলে মানুষ হত্যা করলেই বেহেস্তে যাওয়া যাবে বলে প্রচার করে জঙ্গিবাদ ছড়ানো হচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখের কথা, যারা ইসলামকে হেয় পতিপন্ন করতে চায় তাদের সুযোগ করে দেওয়া হয়। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত তারা ইসলামের ক্ষতি করছে। যারা জঙ্গিবাদে বিশ্বাস করে তাদের ধর্ম নেই, দেশ নেই, সীমানা নেই। তারা ভুল পথে যাচ্ছে, এটা পবিত্র ইসলামের কথা। একজন মুসলমান হয়ে আরেকজন নিরীহ মুসলমানকে হত্যা করে জান্নাতের পথে চলে যাওয়ার ভ্রান্ত ধারণাকে কেন বিশ্বাস করা হচ্ছে? নিরীহ মুসলামানকে হত্যা করলে জান্নাতে নয়, জাহান্নামে যেতে হবে। পবিত্র কোরআন শরীফে আছে এবং নবী করিম সা. বলেছেন- নিরীহ মানুষকে হত্যা যদি করা হয়, তাহলে সে কখনও জান্নাতে যেতে পারে না।’
ইসলাম শান্তিতে ও ভ্রাতৃত্বের ধর্মতে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র। এখানকার ৯০ ভাগ মানুষ মুসলামান। কিন্তু অন্য ধর্মের মানুষও আছেন এই ভূখণ্ডে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং সব ধর্মের মানুষ তার ধর্ম পালন করবে। আমরা এটা পালন করতে পেরেছি। সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করছে। আমাদের ধর্ম পবিত্র ধর্ম, শান্তির ধর্ম। এ ধর্মে নিবেদিতরা যেন ঠিকভাবে সব পালন করতে পারেন সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা চাই, ধর্মকে কেউ যেন হেয় না করে। মুসলমান ভাই-ভাই হিসেবে বসবাস করবে।’
বর্তমান সময়ের জন্য এ সম্মেলন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সৌদি আরবের মসজিদুল হারাম ও মসজিদুন নববী কর্তৃপক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্ট শায়খ ড. মুহাম্মদ বিন নাসের আল খুযাইম ও মসজিদুন নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুল মুহসিন বিন মুহাম্মদ আল কাশিম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখায় তাদের প্রতি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই অতিথিদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে উজ্জীবিত করবে। তাদের বক্তব্য আমাদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করবে। আপনারা যারা এসেছেন তাদের কথা শুনে গেলেন জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তারা মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন।’
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে সৌদি আরবের বাদশাহর ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনের বিরুদ্ধে যে কোনও পদক্ষেপে সৌদি আরবের পাশে থেকে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ। পবিত্র ধর্ম ইসলামের শান্তি প্রতিষ্ঠা, ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করা ও বিপথগামীরা যেন শান্তির পথে ফিরে আসে সেজন্য আমরা সৌদি বাদশাহর পাশে আছি এবং থাকবো। বিশ্বে যারা শান্তিতে বিশ্বাস করে তাদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস দমনে ভূমিকা রাখার জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমান। এখানে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার ওলামা-মাশায়েখদের উপস্থিতি ঘটে। এদিন সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সম্মেলনস্থলে আসতে শুরু করেন ওলামা মাশায়েকগণ। সম্মেলনস্থলের ভেতরে ও বাইরে পুলিশ ও গোয়েন্দারা নিরাপত্তায় নিয়োজিত আছেন। ব্যাপক তল্লাশির মাধ্যমে আগতদের সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করানো হয়।
ওলামা মহাসম্মেলন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয়েছে আর্চওয়ে গেইট। এছাড়া বাইরেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশেপাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে নিরাপত্তা বলয়। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সোয়াট ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরাও রয়েছেন।
/পিএইচসি/ইউআই/জেএইচ/








