১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ৬৭ বছর ধরে চালু ছিল হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলো। সেখানের মাটি পানি বাতাসকে দূষিত করে ট্যানারিগুলো অবশেষে অনেক টানাহেঁচড়ে সরতে বাধ্য হচ্ছে সাভারে। এই ৬৭ বছরে এখানকার পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। সেই ধ্বংস হওয়া পরিবেশ থেকে হাজারিবাগকে সরিয়ে আনতে নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিলেও তা বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলছেন না কেউ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এখানকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না মোটেই।
২০০১ সালে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নিতে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিলেও আইনি প্রক্রিয়া ও নানা তালবাহানায় কেটে গেছে আরও ১৭ বছর। অবশেষে শনিবার উচ্চ আদালতের নির্দেশক্রমে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে নতুন করে এলাকা পরিশোধনের বিষয়টি পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এখন নতুন করে এলাকা শোধনের কাজ শুরুর সময়। এখানকার প্রতি ইঞ্চি জমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘হাজারীবাগের জমি সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার কাজ শেষ হলে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে সেভাবেই গড়ে উঠবে নতুন হাজারীবাগ।’
বুড়িগঙ্গার দূষণ তা দূর করতে উদ্যোগ নিলেও ঠিক কবে নাগাদ তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, হাজারিবাগের বাতাসে উদ্ভট গন্ধ থাকবে আরও অনেকদিন। যে পানি এখন খাওয়া দূরের কথা দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার করা যায় না, সেই পানি ঠিক কী উপায়ে শোধন সম্ভব সেটি নিয়েও কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এ এলাকার মাটি খুড়লে স্তরের পর স্তর পাওয়া যায় পশুর পরিত্যক্ত চামড়া, শিং, হাড়গোড়।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ট্যানারি কারখানাগুলো চলে গেলে শূন্য জমিতে নতুন কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে দেওয়া হবে না। ট্যানারির জমিতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। সেখানে অনুমোদনহীন কোনও স্থাপনা নির্মাণ হতে দেবে না শিল্প মন্ত্রণালয়। হাজারীবাগের জমিতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করতে বহুতলবিশিষ্ট বহুমুখী বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হতে পারে বলে ।
গত ৩০ মার্চ আদালত এক আদেশে ৬ এপ্রিলের মধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলোর সব কার্যক্রম বন্ধ করে আদালতে জানাতে বলেন আপিল বিভাগ। এরপর ট্যানারি কারখানাগুলোকে জরিমানা করে আপিল বিভাগের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন ও পরিবেশের ক্ষতি করায় ১৫৪ ট্যানারি মালিককে বকেয়া বাবদ ৩০ কোটি ৮৫ লাখ জরিমানা পরিশোধের আদেশ স্থগিতের বিষয়ে শুনানি গ্রহণ করবেন আদালত। আগামী ৯ এপ্রিল শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০০১ সালে ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে নিতে দেওয়া হাইকোর্ট এর আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প অন্যত্র সরিয়ে নিতে ২০০৯ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট ফের নির্দেশ দেন। সরকার পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরে ওই সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেও স্থানান্তর না হওয়ায় পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে আদালত অবমাননার মামলা করেন মনজিল মোরসেদ।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ পুরো সময় আমরা এই মামলায় কাজ করেছি। এখানকার যে পরিস্থিতি ততে সেখান থেকে কারখানা সরিয়ে নেওয়ার পরও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা সে নিয়ে নানাসময় সন্দেহ দেখা গেছে। ওখানে পরিদর্শনে গেলেই গায়ে ফোসকা ও চুলকানি নিয়ে ফিরতে হয়েছে। খুব সহজ হবে না আগের জায়গায় ফেরানো।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বারবার সভারে যেতে চেয়েছি। কিন্তু সাভারে যেসব সুবিধা আছে বলা হচ্ছে তা নিশ্চিত করতে পারেনি বিসিক। এখন আমাদের দুকূল হারানোর অবস্থা। আমাদের হয়রানি ও আর্থিক লোকসানের প্রতিবাদে কর্মসূচিতে দেব।
/ইউআই/এসএনএইচ/








