তিন সেমিস্টার পদ্ধতি চালু রাখার বিষয়ে মত দিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)। রবিবার (৩০ এপ্রিল) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী মিলনায়তনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টিদের এক মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিবোর্ডের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মত দেন।
সভায় উপস্থিত হয়ে রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নেওয়া সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও কঠিন। সম্প্রতি ইউজিসি’র (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) নেওয়া বেশ কয়েকটি নির্দেশনার জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তথ্যমন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্ত আরোপ করে সমাধান হবে না। এর ফলও ভালো হয় না। নির্দেশনা দেওয়ার আগে ভেবে দেখা উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা কতখানি সম্ভব।
ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী মিলনায়তনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টিদের ওই মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন পিপলস ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম মোল্লা এমপি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও এপিইউবি’র সেক্রেটারি জেনারেল বেনজীর আহমেদ, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সরোয়ার জাহান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান আবুল খায়ের চৌধুরী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের ভাইস-চেয়ারম্যান ড. কাজী আনিস আহমেদ, খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. রেজাউল আলম, ইবাইস ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. জাকারিয়া লিংকন, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ভাইস চেয়ারম্যান ইউ এ কবিরসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশত ট্রাস্টি ও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ড ও এপিইউবি’র চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান স্যার ফজলে হাসান আবেদ একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান। এ বক্তৃতায় তিনি বলেন, স্নাতক শিক্ষার ক্ষেত্রে তিন সেমিস্টার পদ্ধতির প্রাথমিক উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের ডিগ্রির শর্ত পূরণ করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা। যাদের জন্য শিক্ষা-কার্যক্রমে সময় ব্যয় করাটা অর্থনৈতিকভাবে বোঝা সেই সব শিক্ষার্থীর জন্য তিন সেমিস্টার বিশিষ্ট শিক্ষাবর্ষ অত্যন্ত উপযোগী। উচ্চ শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গেও এই সিস্টেমই সঙ্গতিপূর্ণ।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ আরও বলেন, দুই সেমিস্টার বিশিষ্ট শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের প্রতি সেমিস্টারে বেশি পরিমাণে ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হয়। চার বছরে ১৩০ থেকে ১৫০টি তিন ঘণ্টা বিশিষ্ট ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হয় তাদের। সেমিস্টার প্রতি সম্পন্ন করতে হয় ৬/৭টি তিন ঘণ্টার ক্রেডিট। তিন সেমিস্টার বিশিষ্ট শিক্ষাবর্ষে সেমিস্টার প্রতি ক্রেডিটের চাপ কম থাকে। এক বছরে দুই সেমিস্টার পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়কে অনুৎপাদনশীল করে দেয়। নতুন করে কোর্স নেওয়ার আগে যে কয়েক সপ্তাহ ছুটি পাওয়া যায় সে সময়ে সত্যিকারের খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ বাংলাদেশে নেই। অবসর সময়কে ফলপ্রসূ ও সৃজনশীল কাজে লাগানোর মতো সুযোগ দেশে না থাকায় দুই সেমিস্টারের শিক্ষার্থীরা অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে যেতে পারে।
লিখিত বক্তৃতায় তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাধ্যতামূলকভাবে ২১ দিনের সরকারি ছুটি এবং শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটিতে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত অবসর (বছরে ১২৫ দিন) সময় পান। তার ওপর, বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সেমিস্টারের মাঝে পুরোপুরি এক সপ্তাহ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তিন সেমিস্টারের শিক্ষা পদ্ধতিতে অবসরের জন্য দুই শিক্ষাবর্ষের মাঝে ১৫ দিনের ছুটি থাকে। সুতরাং শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের অবসরের কথা বলে তিন সেমিস্টার পদ্ধতি থেকে দুই সেমিস্টার পদ্ধতিকে শ্রেয়তর বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।
সভায় আলোচকরা প্রতি ব্যাচে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরিসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো থাকলে সেকশন খোলার বিধান রেখে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বিশেষ করে নতুন অনুমতি পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হবে।
বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যানদের মতে, ডুয়েল সেমিস্টার পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা। অনেকে নিজেদের শিক্ষাব্যয় বহনের জন্য প্রাইভেট টিউশন, খণ্ডকালীন চাকরি বা অর্থ উপার্জনক্ষম পেশায় নিয়োজিত হন। ফলে ডুয়েল সেমিস্টার পদ্ধতি থাকলে শিক্ষাব্যয় নির্বাহ করা তাদের জন্য কষ্টকর হবে। সেক্ষেত্রে পড়াশোনা থেকেই তাদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাবে।
এছাড়া স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থানান্তরের ব্যাপারেও সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সভায় বলা হয়, উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থায়নে জমি কেনার পর স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থাপনা তৈরি করা দুরূহ। জমি বন্ধক রাখার মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংক অথবা অন্য কোনও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাম্পাস তৈরির সুযোগ প্রদানের জন্য সরকারকে যথাযথ নীতিমালা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করার পক্ষে মত দেন তারা। এর ফলে নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থানান্তর করতে তা সহায়ক হবে বলে আশা তাদের।
সভায় বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা এবং তা নিরসনের উপায় নিয়ে বেশ কয়েকজন ট্রাস্টি চেয়ারম্যান তাদের পরামর্শ উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম সম্পর্কে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া স্বকীয়তা থাকতে হবে বলে অভিমত দেন তারা।
অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশের (এপিইউবি) পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
/টিএন/








