রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এবার আমের বাজারে কেমিক্যালবিরোধী অভিযানের খবর পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের নজরদারি ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সচেতনতায় রাসায়নিকে পাকানো আমা বিক্রি প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে আম চাষিরাও যেমন লোকসানের সম্মুখিন হচ্ছেন না, ক্রেতারাও নির্ভয়ে আম কিনতে পারছেন।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আম সুস্বাদু হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার ক্রেতাদের কাছে চাহিদা থাকে প্রচুর। প্রতি মৌসুমে এখানকার ব্যবসায়ীদের কাছে বাগানের রাসানিকমুক্ত আম চেয়ে পাঠানো হয়। তবে গত বছর পর্যন্তও অসাধু ব্যবসায়ীরা এই চাহিদার অবৈধ সুযোগ নিয়েছে। সময়ের আগেই বিষাক্ত রাসায়নিকে পাকিয়ে ও পচন ঠেকাতে অতিরিক্ত মাত্রার ফরমালিন দিয়ে আম সরবরাহ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।
রাজশাহীর উপশহর এলাকার আম ব্যবসায়ী জিএম বাবুল চৌধুরী জানান, দুই বছর আগে তিনি দুই মণ করে আম ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক দুই ব্যক্তির কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারা আম পাওয়ার পর একটি আমও খেতে পারেননি। কারণ তার অজান্তেরই অপরিপক্ক আমে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়েছিল। আম ওপরে হলুদ দেখালেও ভেতরে সাদা হয়েছিল। এই ঘটনায় বাবুল চৌধুরীর সঙ্গে ওই দুই ব্যক্তির বেশ কিছুদিনের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। বাবুল চৌধুরী জানান, তার মতো আরও অনেককেই এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত মৌসুম থেকে ‘ম্যাংগো কালেন্ডার’ তৈরি করে দেওয়ায় গাছ থেকে নির্ধারিত সময়ের আগে আম নামাতে পারছেন না চাষিরা। তবে আবহাওয়ার পার্থক্যের কারণে এবার নির্ধারিত সময়ে আগে বাজারে বেশ কিছু আম উঠেছে। কিন্তু সে আমগুলোতে রাসায়নিক পরীক্ষা করে কোনও ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার (সদর) ইফতেখায়ের আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই বছর আগেও আমরা ব্যাপক অভিযান চালিয়েছি আম বাজারে। কিন্তু গত বছর থেকে অনেকের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হওয়ার কারণে রাসায়নিকযুক্ত আম বিক্রির তথ্য আমরা পাইনি। তবে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এমনকি এবারের মৌসুমে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে যাচাই-বাছাই করে অভিযান পরিচালনা করবো। তবে এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অন্য বিভাগগুলোকেও আমাদের সহযোগিতা করতে হবে। কারণ আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি এধরণের কাজগুলো করতে হয়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার লাওঘাট্টা ইউনিয়নের আম ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর আগে বেশি লাভের আশায় অনেকে দিনে আমে ওষুধ মেশানোর পর রাতে ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দিতো। পরেরদিন সকালে ট্রাক থেকে আড়তে আম নামানোর পরেই পেকে যেতো। তবে প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে গতবছর থেকে কমে গেছে। এখনও অনেকে লুকিয়ে লুকিয়ে এ কাজ করে। তবে সংখ্যায় খুবই কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে শিবগঞ্জে ৭টি ও রাজশাহীতে একটি আমবাগান লিজ নিয়েছি। এরমধ্যে ১২ লাখ টাকার ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ করেছি। এই আমগুলোতে কোনও কীটনাশক দেওয়া হয় না। এছাড়া বাগানের অন্য আমগুলোকে পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য মুকুল পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আবার আমের গুটিকে পরিষ্কার করার জন্যও কীটনাশক দিতে হয়। তবে এই আম খেলে ক্ষতি হয় না। কিন্তু কাঁচা আমে ওষুধ মিশিয়ে বিক্রি করলে ক্ষতি হয়।’
রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার মোশারফ ফল ভাণ্ডারের প্রোপ্রাইটার মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আগে বিভিন্ন সময়ে অভিযানে এসে আমে কিছু পেলেই অন্য ঝুড়িতে থাকা ভালো আমগুলো জব্দ করে নিয়ে নষ্ট করে দিতো। আবার ক্রেতাদের অভিযোগের শেষ ছিল না। তবে গত বছর থেকে সে অভিযানও নেই। ক্রেতাদের তেমন অভিযোগও নেই। অভিযোগ বলতে ছোট আম কেন, আমের ওজন কম-এসব অভিযোগ মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়। আর এখন আম বিক্রি করতে গিয়ে অভিযানের তেমন ভয় লাগে না।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, ‘প্রশাসনিকভাবে দেখভাল করার পাশাপাশি আমের ক্ষতিকর দিক মিডিয়ায় বেশি করে প্রচার হয়েছে। এতে করে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হওয়ার কারণে আম পাকানোর জন্য কেমিক্যাল মেশানো অনেকখানিক কমে গেছে। তবে আমরা বাজার মনিটরিং করে থাকি। এধরনের তথ্য আমরা পাইনি।’
গাছে থাকা অবস্থায় আমে কীটনাশক মেশানোর ব্যাপারে দেব দুলাল ঢালী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুকুল ধরা থেকে গুটি হওয়া পর্যন্ত আম গাছে যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয় সেটার জন্য আম খেলে কোনও ক্ষতি হয় না। কারণ কীটনাশনের কার্যকরিতার ক্ষমতা দশদিন পর্যন্ত থাকে। আর এই কীটনাশক ব্যবহার না করলে পোকা-মকড়ের কারণে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আম খুঁজে পাওয়া যেত না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আম গাছে যে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সেই কীটনাশক সবজিতেও ব্যবহার করেন চাষিরা। তবে সবজির ক্ষেত্রে একটু ঝুঁকি থেকে যায়। কারণ অল্প সময়ে সবজি কেটে বাজারে নিয়ে আসার পরপরই খাওয়া হয়।’
রাজশাহীতে আমের বাগান রয়েছে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে। এবার আম এসেছে এক লাখ ২৬ হাজার ৪৮০ গাছে। এসব গাছ থেকে দুই লাখ মেট্রিক টনের বেশি আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন।
/এফএস/
আরও পড়ুন- এই কান্নার শেষ কোথায়!








