ভারতের বিভিন্ন যৌনপল্লীতে পাচার হওয়া যেসব বাংলাদেশি নারী চরম দুর্দশায় রয়েছেন, কিংবা এ দেশের অজস্র হোমে বাংলাদেশের যে নারী ও শিশুরা অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছে, তাদের দেশে ফেরানোর চেষ্টায় এবার এগিয়ে এলেন বলিউড তারকা জন আব্রাহাম। মানবপাচার রোধ করতে তিনি জাতিসংঘের একটি সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করবেন।
বাংলাদেশ থেকে যে নারীরা পাচার হয়ে ভারতে আসেন, তাদের একটা বড় অংশেরই ঠিকানা হয় মুম্বাই বা শহরতলি, কিংবা পুনে-হায়দ্রাবাদ-ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরগুলোর রেড লাইট এরিয়া। যদিও কাউকে উদ্ধার করা সম্ভবও হয় – তারপরও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের দেশে ফিরে যেতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
দিল্লিতে ‘ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম’ বা ইউএনওডিসি নামে জাতিসংঘের যে সংস্থাটি আছে, তারা ঠিক এই সমস্যাটা দূর করার জন্যই কাজ করছে। আর তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন জন আব্রাহাম। তবে তিনি কোনও ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ বা সেরকম কোনও গালভারী নাম নিচ্ছেন না – বরং গোটা প্রচেষ্টাটাই তিনি চালাতে চান নীরবে।
জন এদিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মুম্বাইতে থাকি। প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজে বা টিভিতে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আসা মেয়েদের দুর্দশার খবর পড়ি। এরা কেউ গিয়ে ঠেকে যৌনপল্লীতে, কেউ গৃহপরিচারিকার কাজে বা কারখানায় – এবং এর মধ্যে বারো-তেরো বছরের বাচ্চা মেয়েরাও আছে। এই পাচারের মূলে আছে চরম দারিদ্র্য– সেই জায়গাটিতে আঘাত করতে পারলে আমার মনে হয় এই সমস্যা একটু হলেও কমবে।’
গত ৩০ জুলাই রবিবার ছিল জাতিসংঘের মানব পাচারবিরোধী দিবস – ‘ওয়ার্ল্ড ডে এগেইনস্ট ট্র্যাফিকিং ইন পারসন’। সে দিনই এই পাচারবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন জন আব্রাহাম এবং কথা দিয়েছেন, বলিউডে সিনেমার শ্যুটিং শিডিউল, আসামে নিজের ফুটবল ক্লাব চালানো ও হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি যে করেই হোক এর জন্য সময় বের করবেন।
দক্ষিণ এশিয়াতে ইউএনওডিসি’র মুখপাত্র সমর্থ পাঠকও বলছিলেন, ‘এই পাচার রোধ করার কাজে কোনও গ্ল্যামার নেই । কাজেই সেলিব্রিটিদের সেভাবে আমরা এই অভিযানে পাশে পাই না। তবে জন এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম । ও নিজে শুধু এই সমস্যাটা সম্পর্কে অবহিত তাই নয়, এটা নিয়ে ও অনেক ভেবেছে । আর কিভাবে পাচাররোধে ও সাহায্য করতে পারে, তা জানতে নিজে থেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।’
দক্ষিণ এশিয়াতে ইউএনওডিসি ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ‘টিআইপি (ট্র্যাফিকিং ইন পারসন) প্ল্যাটফর্ম’ গড়ারও ঘোষণা দিয়েছে এ সপ্তাহে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ওই তিন দেশের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের প্রতিনিধি, বিজিবি’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহম্মদ মাহফুজুর রহমান সেখানে স্বীকারও করেন যে, মানবপাচার রোধ করাটা তাদের জন্য এখনও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়েই রয়ে গেছে।
কেন, তার জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট কারণও চিহ্নিত করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রহমান :
ক. ভারতের সঙ্গে সুদীর্ঘ সীমান্ত, যাতে অনেক ফাঁকফোকর আছে।
খ. সংগঠিত ও অসংগঠিত খাতে দু’দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক যত বাড়ছে – তত বাড়ছে পাচারের ঘটনা।
গ. পাচার মোকাবিলায় সুসমন্বিত পরিকল্পনার অভাব।
ঘ. ভাষাগত ব্যবধান। ব্যাঙ্গালোরের যৌনপল্লী থেকে কোনও বাংলাদেশি মেয়েকে উদ্ধার করা হলেও তিনি স্থানীয় পুলিশ বা এনজিও-কে নিজের নাম-পরিচয় বলতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন।
ঙ. উদ্ধার হওয়া নারী-শিশুদের শনাক্তকরণ, তা যাচাই করা, দু’দেশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও বিপুল সময়সাপেক্ষ। যে কারণে ভারতের বহু সরকারি ও বেসরকারি হোমে বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছেন বহু বাংলাদেশি নারী-শিশু।
ভারতের মতো দেশে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় – সাধারণ লোকের বেলায় সরকারি ফাইলপত্র চালাচালিতে বছর ঘুরে যায়, কিন্তু তারকারা জড়িত থাকলে কাজ হয় অনেক দ্রুত। আশা করা যায়, পাচার হওয়া নারী-শিশুদের ফেরানোর চেষ্টাতেও একজন বলিউড তারকা সরাসরি যুক্ত থাকলে অনেক দ্রুত কাজ হবে।
জন আব্রাহাম তাই হেসে বলছিলেন, ‘মানুষ আমাকে ভালবেসে যে সেলিব্রিটির মর্যাদা দিয়েছে – সেটা অন্তত এই একটা মহৎ কাজে লাগুক!’
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
ব্র্যাকের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত







