নগরজুড়ে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়লেও মশার উৎপাদন স্থানগুলোর দিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) কোনও দৃষ্টি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিজাত এলাকায় লোকদেখানো কিছু কর্মসূচি লক্ষ্য করা গেলেও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের স্থানগুলোতে এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনও উদ্যোগ দেখেনি স্থানীয়। অথচ এসব স্থানগুলোকেই মশা উৎপাদনের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগরীর অধিকাংশ বস্তি, বেড়িবাঁধ ও জলাবদ্ধতায় কবলিত নিচু এলাকাগুলোতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব এখনও বেশি। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। তাদের অনেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ হওয়ায় ঠিকমতো চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছেন না। এ কারণে চিকুনগুনিয়ার কঠিন যন্ত্রণা নিয়েই ভুগতে হচ্ছে তাদের। যদিও ঢাকার দুই মেয়রের দাবি— চিকুনগুনিয়া অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন খালপাড়ে সরেজমিন দেখা গেছে, খালের দুই পাশে অবস্থানরত বস্তিবাসীর অনেকেই চিকুনগুনিয়া রোগে ভুগছেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব এলাকায় কোনও ওষধ ছিটানো হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা ওষধ ছিটাতে দেখেননি কোনও কর্মীকে। সিটি করপোরেশনের কোনও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে না এখানে। পুরো খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরা থাকায় মশা সারাক্ষণ ভনভন করছে বলে দাবি তাদের।
একই চিত্র দেখা গেছে অভিযান এলাকা গুলশানের পাশে কড়াইল বস্তিতে। এ এলাকায় অন্তত কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। আশপাশে রয়েছে বড় কয়েকটি পুকুর ও লেক। এগুলো মশা উৎপাদনের অন্যতম স্থান হলেও সিটি করপোরেশনের কোনও কর্মীদের এখানে আসতে দেখেননি স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা কুলসুম বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে জ্বরে ভুগছি। গতকাল থেকে ছোট মেয়েও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসক বলেছেন, ওর চিকুনগুনিয়া হয়েছে। প্রথমে শুনেছি সিটি করপোরেশন আমাদের ফ্রি ওষুধ ও চিকিৎসা দেবে। কিন্তু আমরা তা পাইনি। মশা মারার মেশিনের কথা শুনেছি, কিন্তু দেখিনি।’
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটির মান্ডা, জুরাইন, মীর হাজারীবাগ, কদমতলী, ইসলামবাগ, পাটেরবাগ, পোস্তগোলা, মুগদা, নন্দীপাড়া, শ্যামপুর, কুতুবখালী, ডিএনডিবাঁধ, মাতুয়াইল, নন্দীপাড়া ও ডেমরাসহ নিম্নাঞ্চলগুলোতে এখনও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব কমেনি। বৃষ্টি হলে এসব এলাকায় পানি থৈ থৈ করে। এ পরিস্থিতিতে মশার সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পায়।
সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হলে মশা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গু রোগের মতোই এডিস মশা থেকে চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস শরীরে ঢুকে পড়ে। আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশার জীবাণু সংক্রমিত হয় দেহে। এক্ষেত্রে বাহকের ভূমিকায় থাকে মশা। তাই মশা নিধনই চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, প্রতিষেধকের চেয়ে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধই উত্তম। সেদিক দিয়ে রাজধানীতে এ রোগের বাহক এডিস মশা ও সাধারণ মশা মারার প্রধান দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে সংস্থা দুটির সেবায় সন্তুষ্ট হতে পারছেন না নগরবাসী।
ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক ও ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন বিভিন্ন সভায় জানিয়েছেন, চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের সংস্থার মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বেড়েছে বরাদ্দ বাজেটও। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, র্যালি, আলোচনা সভা ও মাইকিংসহ নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে খোলা হয়েছে জরুরি তথ্যকেন্দ্র। দেওয়া হচ্ছে ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ সামগ্রী। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ হচ্ছে না।
এদিকে সিটি করপোরেশনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংস্থা দুটির মশা মারার মেশিনগুলোর অর্ধেকই নষ্ট। যে কারণে মশক নিধন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বারবার বলার পরও মেশিনগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
এসব বিষয়ে ডিএসসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহউদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সত্যি বলতে অনেক জায়গায় আমাদের কর্মীরা পৌঁছাতে পারেন না। তবে ৫৭টি ওয়ার্ডে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ কমেছে। তবুও আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলি, নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।’
মশা মারার অধিকাংশ যন্ত্র বিকল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র এই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বর্তমানে ২৫০টির মতো মেশিন সচল রয়েছে। এগুলো যান্ত্রিক জিনিস। নষ্ট তো হতেই পারে। নষ্ট হলেও অসুবিধা নেই, এখন আবার কিনবো।’
/জেএইচ/








