নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ

শফিকুল ইসলাম
০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০:০৯আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৫৯

ইলিশ মাছ, ফাইল ছবি প্রতিবছরের জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের পুরো সময়টাই ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু সেই সময় পেরিয়েছে অনেক আগেই। চলে গেছে শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমাও, প্রত্যাশা ছিল ওই সময় অন্তত কিছু ইলিশ ধরা পড়বে। কিন্তু ওই মৌসুমও চলে গেছে। এরপরও নদীতে ইলিশের দেখা নাই। বাজারেও মিলছে না মানুষের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। যাও বা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই সাগরের। সেই ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সবার জানা কথা, সাগরের ইলিশের তুলনায় নদীর ইলিশের স্বাদ বেশি। সাগরের ইলিশের স্বাদ কিছুটা লবণাক্ত হয়ে থাকে, নদীতে এসে স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে ইলিশ উজানের দিকে চলে আসে বলে তার গায়ের লবণ ঝরে যায়, ফলে ইলিশের আকার ও স্বাদ দুটোই বাড়ে। এ কারণে সাগরের চেয়ে নদীর ইলিশের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। তাই জনমনে প্রশ্ন- ‘সময় তো চলে যাচ্ছে, আর কবে দেখা মিলবে সেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশের?’

বরিশাল, ভোলা, ষাটনল, পটুয়াখালী, পাথরঘাটা ও পিরোজপুরের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে পানির স্রোত প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাই সাগর থেকে ঝাঁক বেঁধে ইলিশ নদীর মোহনায় আসতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর গতিপথ পরিবর্তন,জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব,নদীর মধ্যে জেগে ওঠা নতুন চর―এই তিন কারণে নদীতে প্রয়োজনীয় স্রোত নেই। আর এ কারণেই প্রবল বৃষ্টি থাকার পরেও এই ভরা মৌসুমে ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা।

এদিকে, উপকূলীয় নদ-নদীতেও আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। উত্তাল মেঘনা-তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়েও ইলিশসহ কোনও মাছেরই দেখা মিলছে না জেলেদের জালে। তবে জেলেদের দাবি, সাগরে প্রচুর ইলিশ রয়েছে।

ইলিশের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত পিরোজপুরের বলেশ্বর ও সন্ধ্যা ভোলার তেঁতুলিয়া,পটুয়াখালীর পায়রা,আন্ধারমানিক, আগুনমুখো এবং চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনার ষাটনল এলাকায় প্রত্যাশিত ইলিশ মাছ নেই। তবে গত কয়েকদিন সাগরে কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে বলে জানা গেছে।

শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমায় ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশায় থাকলেও জেলেদের সে আশা পূরণ হয়নি। তাই চলতি ভাদ্র মাসের শেষের দিকের জোয়ারে কিছু মাছ পাওয়ার আশা করছেন জেলেরা। এখন তারা সেই আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন পিরোজপুরের পাড়ের হাটের ইলিশের আড়তদার আফজাল মিয়া।

ভোলার ইলিশ ব্যবসায়ী (আড়তদার) মোকাররম হোসেন টেলিফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কিছু জেলে নদীতে সারা বছরই বিভিন্ন মাছের পোনা ধরে। এর মধ্যে ইলিশের পোনাও জালে ধরা পড়ে। এতে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়। ভরা মৌসুমে জেলেদের জালে ইলিশ মাছ কম ধরা পড়ার এটিও একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারেও গত এপ্রিল-মে মাসে কাঁচকি মাছের সঙ্গে ইলিশের পোনা দেদারসে বিক্রি হতে দেখা গেছে এবছর। ফলে ব্যাপক হারে মাছের পোনা নিধনের ঘটনায় নদীতে ইলিশের পরিমাণ একেবারেই কম।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি ওজনের বেশি বড় সাইজের ইলিশের সরবরাহ খুবই কম। গতবছরের তুলনায় এবার বড় সাইজের ইলিশের দামও কিছুটা বেশি। তবে মাঝারি সাইজের ইলিশের সরবরাহ ভালো, দামও সহনশীল রয়েছে। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের কিছু বেশি ওজনের সাইজের ইলিশের হালি বর্তমানে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আর জাটকা সাইজের ইলিশ  বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকা কেজি দরে।

ভরা মৌসুমে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পাথরঘাটা ও পিরোজুরের পাড়ের হাটের ইলিশ মাছের আড়তগুলোয় এখন ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, প্রতিবছরের জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস জুড়ে পুরোটাই ইলিশের ভরা মৌসুম। এই মৌসুমে জেলেরা দলে দলে জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন। অতীতের মতো এবছরও তারা জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে গেছেন। কিন্তু জালে ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে না। এ কারণেই ইলিশের মোকাম বলে পরিচিত ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর ও পিরোজুরের জেলে ও ইলিশ ব্যবসায়ীরা অনেকটা হতাশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইলিশ সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত পাইকারি বাজার ও ইলিশের মোকামগুলোয়। বরিশাল পোর্ট রোডের ইলিশের পাইকারি ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন জানান, প্রতি বছরের ইলিশের এই মৌসুমে এই আড়তগুলোয় শ্রমিকরা ট্রলার থেকে ইলিশ মাছ ওঠানো নামানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করতো। কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। এ বছর প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ মিলছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘গত ২৮ আগস্ট সোমবার এক কেজি থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৯২ হাজার টাকা মণ দরে। এক কেজি সাইজের ইলিশ ৫৬ হাজার টাকা মণ দরে ও জাটকার চেয়ে কিছুটা বড় সাইজের ইলিশ প্রতি মণ ২৯ থেকে ৩৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।’

স্থানীয় একাধিক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, উপকূলীয় নদ-নদীতে আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। বরিশালের মোকামে গত কয়েক দিনে ইলিশ সরবরাহের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সংকট দেখা দেওয়ায় বরিশাল মোকামের অনেক শ্রমিক ইলিশ ওঠানো ও নামানোর কাজ ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। আবার অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন।

এদিকে ভোলা সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নদীতে চর পড়ার কারণে সাগর ও নদ-নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ ধরা পড়ছে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সাগরে প্রচুর মাছ আছে। আশা করা যায়, শিগগিরই কোনও এক সময় নদীতেও জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়বে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দেশে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছর তা ৪ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে।

এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। আশা করা যাচ্ছে, ২০১৭ সালের শেষদিকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এসব সফলতা এসেছে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ ভাগ ইলিশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের নদ-নদীতে ধরা মাছের ১২ শতাংশই ইলিশ। বাংলাদেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) এর অবদান এক শতাংশ। এক মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় নদীর পরিবেশ, জাটকা সংরক্ষণ ও অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে বছরে ইলিশের বাণিজ্য হতো কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ দিতে জেলেদের বছরে দু’বার ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ২০১১ সালে সংশোধিত আইন অনুযায়ী ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদ উদয় হওয়ার আগে তিনদিন ও চাঁদ উঠার পরের সাত দিন মোট ১১দিন উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ দিন।

এ ছাড়াও জাটকা সংরক্ষণে এবং প্রজননের সুযোগ দিয়ে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুইমাসও নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। একজন জেলেকে মাসে দেওয়া হয় ৪০ কেজি চাল। দেশের ইলিশ অধ্যুষিত ১৬ জেলার প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবার এ খাদ্য সহায়তা পায় বলে জানায় মৎস্যসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র। এ ছাড়া এই দুই মাস জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করা হয়।

 

 

/এমও/টিএন/আপ-এসটি
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম