চার স্বজনের লাশ ফেলে পালিয়ে আসে ইউনূসের পরিবার

নুরুজ্জামান লাবু, টেকনাফ সীমান্ত থেকে
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২২:৪৭আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২৩:৫০

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ইউনূস

২৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিটি দিন ছিল আতঙ্ক আর উদ্বেগের। ভয় নিয়ে কোনও মতে বাড়ির ভেতরেই ছিলেন তারা। দিনের বেলা বাড়িতে থাকলেও রাত কেটেছে জঙ্গলে। তবুও বাড়ি ছাড়তে চাননি তারা। নিজেদের বাস্তুভিটা ছেড়ে কোথায় যাবেন? কিন্তু মিলিটারিরা সড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করতো। ঈদের পরদিন দুপুরের দিকে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল আপন  দু’বোন ছমিরা (১৬) আর শাহিদা (১৩)। তাদের পাশেই খেলছিল দুই ভাগ্নে-ভাগ্নি ছুবেরা (৫) আর নূর আলম (৩)। হঠাৎ মিলিটারিরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসে বাড়ির সামনের সড়কে। গুলিতে একসঙ্গে ঝড়ে যায় চার জন। এই দৃশ্য দেখে নিজের প্রাণ বাঁচাতে বাড়ির পেছন দিয়ে একেবারেই খালি হাতে পালিয়ে আসেন মোহাম্মদ ইউনূস ও তার পরিবারের সদস্যরা। সেদিন আর বাস্তুভিটার মায়া করেননি। বুঝেছিলেন এখানে আর তাদের থাকা হবে না। মংডুর আশুলতা পাড়ায় বাড়ির সামনে দু’বোন আর ভাগ্নে-ভাগ্নির লাশ ফেলে রেখে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে আসেন নাফ নদীর সীমান্তে।

সঙ্গে থাকা ইউনূসের স্ত্রী হামিদা আর তার মায়ের স্বর্ণের দুল মাঝির হাতে তুলে দিয়ে উঠে পড়েন নৌকায়। সেই নৌকা তাদের নিয়ে যায় সেন্টমার্টিনের দিকে। সেখানে কোস্টগার্ড তাদের ধরে পাঠিয়ে দেয় শাহ পরীর দ্বীপে। সেখানে তাদের আটক করে বিজিবি সদস্যরা। একরাত বিজিবি’র হেফাজতে থেকে পরে তাদের জায়গা হয় টেকনাফের মসুলি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

মঙ্গলবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে ইউনূস গিয়েছিলেন টেকনাফের শাপলাপুরে তার এক স্বজনের বাসায়। কিছু টাকা চাইতে। সেই টাকা নিয়ে যখন টেকনাফ ফিরছিলেন তিনি, তখন তার সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশায় বসে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

ইউনূসের চোখে এখনও সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করে ভাসছে। দু’বোন আর ভাগ্নে-ভাগ্নির কথা মনে হলেই কষ্টে বুকটা তার কেঁদে ওঠে। সিএনজি অটোরিকশায় চালকের পাশে বসা ইউনূসের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা শুরু হতেই বার কয়েক সে চোখের জল মোছেন, আর বলেন, ‘কী করবো?’ বাড়িতে বড় একটি লেদ কারখানা ছিল তাদের। আর্থিকভাবে স্বচ্ছলই ছিল তাদের পরিবার। কিন্তু সেনা-মগদের অত্যাচারে বাড়িতে টেকা যাচ্ছিল না। শেষে প্রাণ বাঁচাতে বাস্তুভিটা আর লেদের কারখানা ছেড়ে চলে এসেছেন এপারে বাংলাদেশে।

স্বজনদের লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে আসা ইউনূস পরিবারের সদস্যরা

অটোরিকশায় বসেই ইউনূসের সঙ্গে যখন আমি কথা বলছিলাম, তার ভাষা বুঝতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল আমার। সেই কষ্ট দূর করে দোভাষীর কাজ করলেন সিএনজি চালক জাফর। ইউনূসকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, যদি শান্তি ফিরে আসে, আবার কি নিজের বাস্তুভিটায় ফিরে যাবেন? ইউনূস কিছুটা ভাবলেশহীন। কক্সবাজার থেকে টেকনাফে যাওয়ার মেরিনড্রাইভের পাশে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। কিংবা হয়তো দূরের আকাশের দিকেও তাকিয়েছিলেন। বললেন, ‘গেলে যদি আবার ঝামেলা শুরু হয়। এবার তো প্রাণ নিয়ে আসতে পেরেছি। যদি ওরা মেরে ফেলে।’ একটু থামলেন ইউনূস। আবার শুরু করলেন, ‘যদি বাংলাদেশ সরকার সব ব্যবস্থা করে ফেরত পাঠায়, যদি রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্বের অধিকার দেয় বার্মা। যদি নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাহলে ফিরে যাবো। নিজের বাড়িতে কেউ কি না ফিরতে চায়?’ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ২৩ বছরের ইউনূস। তারপর যা বললেন, তা শুনে হৃদয়টা খানখান হয়ে যাবে সবারই। তিনি বলেন, ‘যদি সরকার জোর করে পাঠিয়ে দিতে চায়, তবে বিষ খেয়ে সবাই মারা যাবো। কারণ, এত আতঙ্ক, ভয়, লাঞ্ছনা আর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার চাইতে মরে যাওয়াই ভালো।’

ইউনূসের মতোই প্রায় একই ভাষ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে গত মাসের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আসা প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার। যদিও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, ‘এই সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়ে গেছে।’

গত তিন দিনে কক্সবাজারের উখিয়া, কুতুপালং, বালুখালী, তমব্রু, টেকনাফ, নয়াপাড়া এলাকায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে আলাপকালে সবাই প্রথমেই সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা বলেন। কিভাবে চোখের সামনে বাড়ির পুরুষদের ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে মগ-সেনারা। নারীদের ধর্ষণ আর বাড়িতে আগুন দেওয়ার সেসব দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে তাদের।

তমব্রু মেডিক্যাল ক্যাম্পের লাইনে দাঁড়ানো পঞ্চাশোর্ধ দিলারা মঙ্গলবার এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘তমব্রু সীমান্ত থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে রাইম্বংখালীতে তাদের বাসা। এই ঝামেলা শুরু হওয়ার পরপরই চলে আসেন এপাড়ে। তিন মেয়ে আর এক ছেলের সংসার ছিল তার। কিন্তু ঈদের আগে তার সামনেই স্বামী ওবায়দুল আর বড় ছেলে হোসেন আহমেদকে ধরে জবাই করে মগরা। ওইদিন তিনি বাসা থেকে পালিয়ে আসেন তিন মেয়েকে নিয়ে।’ দিলারা বলেন, ‘পরিবারের পুরুষ সদস্য কেউ নেই। কোনোভাবে পালিয়ে এসে তমব্রুর নোম্যান্সল্যান্ডে আশ্রয় নেই।’

বুধবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তপ্ত রোদের মধ্যেই হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। টেকনাফ থেকে শাহ পরীর দ্বীপের দিকে যেতে আট কিলোমিটার দূরেই সাবরাং এলাকা। সেখান থেকে আর সিএনজি বা টমটমও চলে না। সেই পায়ে হাঁটা পথের পাশে বসে আছে সদ্য  মংডু থেকে আসা অনেক পরিবার। সারি করে বসে ছিলেন কালো বোরকায় আচ্ছাদিত তিন নারী। একেবারে শেষের জনের কোলে একটি শিশু। সামনে তিনটি প্লাস্টিকের বস্তা। কাছে গিয়ে কথা বলতেই জানা গেল, এই পরিবারের চার জন পুরুষ সদস্যের মধ্যে তিন জনকে ধরে নিয়ে গেছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তাদের আর কোনও খোঁজ নেই। তারা সকালে শাহ পরীর দ্বীপ দিয়ে এপাড়ে এসেছেন। বসে আছেন পরিবারের একমাত্র পুরুষ সদস্যও। এই পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক নারীটির নাম মায়মুনা (৫০)। পাশে তার মেয়ে রাবিয়া (৩৪),আর রাবিয়ার মেয়ে ছানোয়ারা (২১)। ছানোয়ার কোলে পাঁচ মাসের শিশু হাবিবা। রাবিয়া জানান,তার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। মা থাকতেন তার সঙ্গেই। মংডুর পুবকূল ধানখালীতে। চাষের জমি রয়েছে কয়েক কানি। তা চাষাবাস করতেন স্বামী আব্দুল্লাহ। বিয়ে দেওয়ার পর মেয়ে ছানোয়ারা আর তার স্বামী কাসিমও তাদের সঙ্গেই আলাদা ঘর তুলে থাকতেন। বেশ সুখের সংসারই ছিল তাদের।

জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী-শিশু

রাবিয়ার ভাষ্য, গত মাসে গ্যাঞ্জাম শুরু হলেও ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই বাড়িতে থাকতেন তারা। বাইরে বেরোতেন কম। কিন্তু দিন ছয়েক আগে একদিন মগ-সেনারা তাদের বাড়ি থেকে তিন জন পুরুষ সদস্য রাবিয়ার স্বামী আব্দুল্লাহ, ১৭ বছরের ছেলে ইয়াসিন, আর মেয়ে জামাই কাশিমকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছেন। তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে কিছুই জানতে পারেননি।

রাবিয়ার মেয়ে ছানোয়ারা জানান, ‘ওই দিন রাতেই বাড়ি ছাড়েন তারা। তিন-চার দিন জঙ্গলে জঙ্গলে থাকেন। পরদিন দুপুরে তাদের বাড়িটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জঙ্গলে বসে সেই দৃশ্য নিজের চোখে দেখেন তারা। তারপর আরও দুই দিন এপাড়া-ওপাড়ায় থেকে মঙ্গলবার রাতে মংডুর নাফ নদীর সীমান্তে এসে নৌকায় ওঠেন। সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে পার হন নদী। সকালে শাহ পরীর দ্বীপে তাদের কিছু খাবার দিয়েছিল লোকজন। তাই খেয়ে সাবরাং সেনাক্যাম্পের একটু আগে বসে আছেন, পরিবারে বেঁচে থাকা একমাত্র পুরুষ সদস্য রাবিয়ার ভাই ও ছানোয়ারার মামা ফারুকের অপেক্ষায়।

শিশুসহ এই চার জনের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী মায়মুনা বলেন, ‘ফারুক ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে। ও সেদিন বাড়িতে ছিল না।’ তিনি জানান, এখন তারা মহিলারা কোথায় গিয়ে কোন ক্যাম্পে উঠবেন বুঝতে পারছেন না। ফারুক আসলে তার সঙ্গে যাবেন কোনও এক ক্যাম্পে। মায়মুনা, রাবিয়া, ছানোয়ারা বলেন, ‘চোখের সামনে এত নৃশংসতা এর আগে কখনও  দেখিনি। এখনও ভয় তাড়া করে ফেরে। আর কোনোদিন হয়তো বাড়িতে ফিরে যেতে পারবো না। ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিয়েছি ভবিষ্যত।’

এই পরিবারের পাশেই ছেলেকে নিয়ে বসেছিলেন নাহিদা (৩০) নামে এক নারী। মংডুর সিন্ধিপাড়ার এই বাসিন্দা এপাড়ে এসেছেন বুধবার সকালে। চার দিন আগে মগ-সেনারা তার স্বামী নূরুল আলম আর একমাত্র মেয়ে সাবেকুন্নাহার (১৩) কে ধরে নিয়ে যায়। তাদের আর কোনও খোঁজ পাননি তিনি। ওই দিন ছোট ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালান তিনি। প্রাণ বাঁচাতে তিন দিন জঙ্গলে  ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে নৌকায় ওঠেন নাফ নদীর ওপার থেকে। হাতে কোনও টাকা-পয়সা ছিল না। প্রতিবেশীরা তার নৌকার ভাড়া দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা করছেন প্রতিবেশী স্বজনদের জন্য। একা একা কোথায় যাবেন? প্রতিবেশীদের পেলে একসঙ্গে কোনও একটি ক্যাম্পে ঠাঁই নেবেন এই আশায় বসে আছেন তিনি।

আরও পড়ুন: 

রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান: রাষ্ট্রপতি

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম