রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার জন্য রবিবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশে আসছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির দফ্তরের মন্ত্রী টিন্ট সুয়ে। পরদিন সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো ও কফি আনান কমিশন রিপোর্টের বাস্তবায়নের ইস্যু দু’টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী নির্যাতন শুরু করলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ পর্যন্ত (১ অক্টোবর) পাঁচ লাখের ওপর রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির দফতরের মন্ত্রী চো টিন্ট সুয়ে রবিবার দিবাগত রাত ১ টার দিকে বাংলাদেশে আসছেন।
মিয়ানমারের মন্ত্রীর ঢাকা সফরকালে বৈঠক প্রসঙ্গে সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। মিয়ানমারের মন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সেই পাঁচ দফা প্রস্তাবই হবে আমাদের আলোচনার মূল বিষয়।’
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তার পাঁচ দফা প্রস্তাবে বলেছেন, অবিলম্বে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালু, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া, তাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও কফি আনান কমিশনের রিপোর্টের বাস্তবায়ন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই পাঁচ দফার মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো ও কফি আনান কমিশন রিপোর্টের বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ সহিংসতা বন্ধ বা মানবিক কার্যক্রম শুরু করা বা নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানে পারে। কিন্তু সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার মিয়ানমারের।’
রোহিঙ্গাদের কিভাবে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নির্ধারণের জন্য চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ একটি রূপরেখা দেয় মিয়ানমারকে। এরপর ২৫ আগস্টের পর ওই রূপরেখার ৯০ শতাংশ অক্ষুণ্ন রেখে, সামান্য সংযোজন-বিয়োজন করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে জাতিরসংঘে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পুনরায় একটি প্রস্তাব হস্তান্তর করা হয়। পরর্ব্তী সময়ে ওই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৯২ সালে যে প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসন হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণভাবে এখন আর সম্ভব নয়। কারণ এখন সময় ও পরিস্থিতি ভিন্ন। ওই চুক্তির যেখানে যে ধরনের সংশোধন প্রয়োজন, আমরা নতুন প্রস্তাবে উল্লেখ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেখানে বলা ছিল, রোহিঙ্গারা পরিচয়পত্র দাখিল করার পর তারা মিয়ানমারে যাওয়ার অনুমতি পাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কারও কাছে এ পরিচয়পত্র নেই। ফলে এটি আর গ্রহণযোগ্য নয়।’
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ আছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘মিয়ানমার চায়, তারা ভেরিফিকেশন করবে। বাংলাদেশ চায়, এটি যৌথভাবে হতে হবে এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও যুক্ত করতে হবে। এই বিষয় নিয়েও সামনে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা হবে।’
কবে নাগাদ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে, এই প্রসঙ্গে সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৭৮ বা ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের অবস্থান এবং বর্তমানে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওই সময়ে মিয়ানমারের বন্ধুর সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু বর্তমানে দেশটির বন্ধুসংখ্যা অনেক।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠনোর সমঝোতা করতে বাংলাদেশের ছয় মাসের বেশি সময় লেগেছিল। ২০০৫ সালে যখন মিয়ানমার এককভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়, তখন ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। অর্থাৎ ১৩ বছরে ওই পরিমাণ রোহিঙ্গা ফেরত গিয়েছিল।’
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা প্রসঙ্গে সরকারের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘১৯৯২ সালে আমরা এ বিষয়ে যত সোচ্চার ছিলাম, এখন তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি সোচ্চার। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ রাখছি; যা ১৯৯২ সালে আমাদের প্রয়োজন হয়নি।’








