রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের বিবৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে বলে মনে করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন জাতিসংঘের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় দুপুর ৩টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ সদর দফতরের ইকোসক চেম্বারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা আরিয়া ফর্মুলা সভায় অংশ নেন। আরিয়া ফর্মুলার এই সভার আয়োজন করে ব্রিটিশ ও ফরাসি ডেলিগেশন। অ্যাডভাইজরি কমিটি অন রাখাইন স্টেট এর চেয়ারম্যান নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান এ সভায় বক্তব্য রাখেন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, মিয়ানমার সরকারের দেওয়া বিবৃতি আর রাখাইন প্রদেশের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিসের র্যাপিড রেসপন্স মিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এমনটিই তুলে ধরা হয়েছে। ২৫ আগস্টের পর থেকে আজ (শুক্রবার) সকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লাখে।’
গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে মিয়ানমার পরিস্থিতির সমাধানে যে পাঁচটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছিলেন, রাষ্ট্রদূত নিজের বক্তৃতায়ও সেগুলো তুলে ধরে বলেন, ‘সহিংসতা ও একটি জাতিকে নির্মূলের প্রক্রিয়া বন্ধ, মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন প্রেরণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সেফ জোন তৈরি, জোরপূর্বক উচ্ছেদকৃত মানুষদের নিজ ভূমিতে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তন এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।’
রাষ্ট্রদূত মোমেন আরও বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক জান্তার উপর্যুপরি উসকানি এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন সত্ত্বেও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনার প্রয়োজন হবে।’ এ ধরনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের অংশগ্রহণ ও তদারকি ছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও অর্থপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল সমস্যা সমাধান করা কঠিন হবে।’
স্থায়ী প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রীর উক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘এই সংকটের শিকড় মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারে নিহিত।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর তিনবার আলোচনায় বসে। ১৩ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। নিরাপত্তা পরিষদ এই সহিংসতার নিন্দা জানায় এবং মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা সৃষ্ট রাখাইন প্রদেশের সাধারণ জনগণের ওপর উপর্যুপরি এই সহিংসতা বন্ধ, রাখাইন প্রদেশে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা, আইন-শৃঙ্খলার পুনঃস্থাপন, সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক আর্থ-সামাজিক পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
এছাড়া গত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিরাপত্তা পরিষদের একটি উন্মুক্ত সেশনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে দেশটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ওপর বিবৃতি দেন। শুক্রবারের সভায় মহাসচিব মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেওয়া তিনটি বার্তার পুনরুল্লেখ করেন। সামরিক বাহিনীর অপারেশন বন্ধ করা, বাধাহীনভাবে মানবিক সাহায্যের সুযোগ দেওয়া এবং রোহিঙ্গা শরানার্থীদের তাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বপ্রণোদিত ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবর্তনের টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
বৈঠকে কফি আনান তার বক্তব্যে সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের কাছে পেশ করা ‘অ্যাডভাইজরি কমিটি অন রাখাইন স্টেট’ এর রিপোর্টের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করেন। রাখাইন প্রদেশের জনগণের স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও চলমান সংকট সমাধানের লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার তার কমিশন প্রণীত রিপোর্টের সুপারিশমালার দ্রুত বাস্তবায়ন করবে বলেও কফি আনান আশা প্রকাশ করেন।
কফি আনান রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংশোধনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন, মানবিক সহায়তা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত নিরাপত্তা ও দ্বিপাক্ষিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা রক্ষা করার বিষয়ে জোর দিয়ে কফি আনান বলেন, ‘এই সুসম্পর্ক ও সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ভয়াবহ রোহিঙ্গা সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না রাখাইন প্রদেশের জনগণের কল্যাণে মিয়ানমার সরকার, রাখাইন জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত হয়ে কাজ না করে।’
নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্যই এ সংকট সমাধানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এটিকে মানবিক বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে বলেন, “এনাফ ইজ এনাফ। আমরা এটি আর গ্রহণ করতে পারছি না। আমরা মিয়ানমার সিকিউরিটি ফোর্সের এই হীন কাজের নিন্দা জানাই”।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের বাইরে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিরা সেখানে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অফিস অব দ্যা হাইকমিশন অব হিউম্যান রাইটস্, অফিস ফর দ্যা কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স, ইউএনএইচসিআর এর প্রতিনিধি, ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।
আরও পড়ুন- নিরাপত্তা পরিষদে আবারও রোহিঙ্গা নির্যাতনবিরোধী প্রস্তাব আটকে দিলো চীন-রাশিয়া








