ক্যাম্প থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও কাজের সুযোগ না থাকলেও নজরদারির অভাবে কক্সবাজারের স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসায় কাজে যোগ দিচ্ছেন রোহিঙ্গা শিক্ষক ও ছাত্ররা। আরাকানের মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্ররা কক্সবাজারের স্থানীয় মাদ্রাসায় শিক্ষকতা যোগ দিচ্ছেন। এছাড়া মসজিদে ইমামতিও করছেন। পাশাপাশি যেসব শিশু-কিশোর মিয়ানমারে পড়াশোনায় ছিল, তারাও কক্সবাজারের স্থানীয় মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস করছে। আর আশেপাশে বাঙালি বাড়িতে পাচ্ছে খাওয়ার সুবিধাও। তবে উখিয়ার কোনও স্কুল-কলেজে রোহিঙ্গা ছাত্র বা শিক্ষকের যুক্ত হওয়ার কোনও তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা রাজাপালং ইউনিয়নে ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. একে এম ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে এসে বাংলাদেশের কোনও প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মাদ্রাসা ও মসজিদে কাজের সুযোগও নেই।’ স্থানীয় পুলিশের এই কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও বর্ণনা থানায় দেওয়ার পরামর্শ দেন।
কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানে প্রায় একবছর আগে থেকেই কাজ করছেন রোহিঙ্গা আলেমরা। জীবনরক্ষার তাগিদে বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উখিয়া সদর বাজার থেকে বালুখালী যেতে কুতুপালং বাজারের আগে সড়কের বাম পাশে পাহাড়ের ভেতর মাদ্রাসা মুয়াজ বিন জাবাল অবস্থিত। ঘন বনের ভেতর দিয়ে লালরঙা মাটি কাটা রাস্তা দিয়ে আধা কিলোমিটার দূরেই এই প্রতিষ্ঠান। প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের অভাবে মাদ্রাসার কিতাব বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান হেফজ বিভাগের পরিচালক মাওলানা মনির আহমদ। তিনি বলেন, ‘হেফজ বিভাগে ১৬ জন ছাত্র। এরমধ্যে বাঙালি ৬ জন ও রোহিঙ্গা ১০ জন।’
মাদ্রাসার পাশে বসবাস করেন স্থানীয় শামসুল আলম। তার দুই ছেলে এই মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে পড়াশোনা করেন। তিনি জানান, ‘মুয়াজ বিন জাবালের জায়গা সরকারের খাসজমি। এটি দখল করে মাদ্রাসা ও মসজিদ তৈরির জন্য দান করেছেন মাস্টার শামসুল আলম।’ তবে মাস্টার শামসুল আলমকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি।’ অভিভাবক শামসুল আলম জানান, ‘মাদ্রাসার জমির কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই।’ চট্টগ্রামের কোনও এক আলেম এই মসজিদটি নির্মাণ করে দিয়েছেন বলেও জানান শামসুল আলম।
মাদ্রাসা মুয়াজ বিন জাবালের পরিচালক মাওলানা মনির আহমদ স্থানীয় হ্নীলা এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে তিনি দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘মাসে ছয় হাজার টাকায় এখানে চাকরি করি। মাদ্রাসায় পড়তে রোহিঙ্গা ছাত্রদের বেতন দিতে হয় না। তারা আশোপাশের বাড়িতে লজিং থাকেন।’ তবে তার মন্তব্যের বিরোধিতা করে রোহিঙ্গা শিক্ষার্থী এনায়েতুর রহমান। এই শিক্ষার্থী বলে, ‘আমরা মাদ্রাসায় পড়ার ফি হিসাবে বছরে ৫০০ টাকা দেই।’ তার সঙ্গে দেখা হয় মুয়াজ বিন জাবাল মাদ্রাসার সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা তার সঙ্গে। এ সময় উপস্থিত ছিল আরেক শিক্ষার্থী জাবের। তারা দু’জনেই কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া ক্যাম্পে বাস করছে। মিয়ানমারের ফহিরাবাজার গ্রামে তাদের বসবাস ছিল। সেখানেই একটি মাদ্রাসায় তারা পড়াশোনা করতো। গত কোরবানির ঈদের আগে তারা মিয়ানমার ছেড়ে আসে।
একই প্রতিষ্ঠানে ছোট হুজুরের দায়িত্বে আছেন রোহিঙ্গা শিক্ষক আজিমুল্লাহ। ২০ বছর বয়সী এই শিক্ষক বুধবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর নিজেই মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের কক্ষটি ঝাড়ু দিয়ে ছাত্রদের পড়াতে বসেন।
আগের দিন মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর কথা হয় স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম মাওলানা আনাসের সঙ্গে। মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তিনি। এশার নামাজের আগে এ প্রতিবেদকের বাহন কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে আসার সময় যাত্রাপথের সহযোগিতা চাইলে লিফট দেন তিনি। এ সময় আলাপে-আলাপে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসি। উখিয়ার রাজাপালংয়ের একটি গ্রামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পেয়েছি।’ নির্দিষ্ট কোনও বেতনে যোগ না দিলেও স্থানীয় মুসল্লিরা হাতে-হাতে কিছু অর্থ দেন। এতেই সন্তুষ্ট মাওলানা আনাস।
এ বিষয়ে রাজাপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ছাত্ররা এখানে স্থানীয় কোনও মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে বলে আমি শুনিনি। কেউ বলেনি। তবে বালুখালী ও কুতুপালংয়ের কিছু প্রতিষ্ঠানে অনেকে যুক্ত হয়েছে বলে শুনেছি। আমি নিজে দেখিনি। এটা ঠিক যে, রোহিঙ্গারা এখানে এখন আমাদের ডাবল।’
কথা বলার জন্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে মুয়াজ বিন জাবাল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাস্টার শামসুল আলমের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
ছবি ও ভিডিও: সালমান তারেক শাকিল
আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গাদের জন্য ‘রিফিউজি ক্যাম্প’ করছে মিয়ানমার!








