রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমন্বয় নেই এনজিওগুলোর মধ্যে

উদিসা ইসলাম
১৪ নভেম্বর ২০১৭, ১০:০২ আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ১৬:৩৮

রোহিঙ্গা ক্যাম্প কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ১৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারপরও তাদের সহায়তা দেওয়ার একটি সার্বিক পরিকল্পনা করা এখনও সম্ভব হয়নি। পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, ক্যাম্পগুলোয় অর্ধশতাধিক এনজিও প্রায় ১৩০টি কর্মসূচি চালাচ্ছে। তারপরও পূর্ণ সহায়তা পায়নি অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা।

সমন্বয়ের জন্য ‘ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ’ ও ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশন’ এর মতো সংস্থা তৈরি করা হয়েছে। তবে স্থানীয় এনজিওগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং কিভাবে তাদের কাজে লাগানো যায় সেদিকে কঠোর নজরদারির কথা বলছেন পর্যবেক্ষকরা।

জেলা প্রশাসন জানায়, এখন পর্যন্ত এনজি ব্যুরো থেকে মাত্র ৭১টি এনজিও রোহিঙ্গাদের ত্রাণ-সহায়তায় কাজ করার অনুমোদন পেয়েছে। আর জেলা প্রশাসকের ১৩ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোয় কাজ করছে ৬৪টি এনজিও। তবে কক্সবাজার ও আশপাশ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়াই কাজ করে অনেক এনজিও।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

বিষয়টি স্বীকার করে সহকারী কমিশনার প্রিয়াঙ্কা ফারজানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু এনজিও আছে যারা জেলা প্রশাসনকে অবহিত না করেই কাজ করছে।’ তবে সমন্বয়হীনতা নিয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলতে রাজি হননি।

‘ইন্টার সেক্টর কো অর্ডিনেশন গ্রুপ’ এর (২৭ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বরের রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন-৯) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পরিকল্পনায় সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও আবাসনের বিষয়ে স্থানীয় ও বাইরে থেকে আসা জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি পরিকল্পনা দরকার। তারা বলছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ভীষণ ভঙুর ও  ট্রমার মধ্যে আছে।

সমন্বয়হীনতার উদাহারণ দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে ওয়াশ কর্মসূচিতে ১০০ জনের জন্য একটি টয়লেটের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের গোসলের সুযোগটাও করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এখন।

যদিও ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে ব্যক্তিগত বা উপজেলা নেতাদের উদ্যোগে বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার সহায়তায় কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই যেখানে-সেখানে টিউবওয়েল বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইমার্জেন্সি ল্যাট্রিন

তাদের ৫ নভেম্বরের ‘পরিস্থিতি প্রতিবেদনে’ বলা হয়েছে, ওয়াশ খাতের (নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন) সার্বিক লক্ষ্য ১১ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। এখন পর্যন্ত ওয়াশ কর্মসূচির মাধ্যমে সহযোগিতা পেয়েছেন ৫ লাখ ২০ হাজার ৮০০ জন। ওয়াশ খাতের সহযোগিতা পৌঁছানো বাকি প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার ২০০ জনের মধ্যে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান গত সেপ্টেম্বর থেকে কাজ করছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরু থেকেই সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সবার কাছে একশ ভাগ সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি আবার একই জায়গায় একই রকমের সহায়তা একাধিক সংস্থা পৌঁছে দিচ্ছে এমনও দেখা গেছে। এর কারণ রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন না হওয়া। এখনও অনেক রোহিঙ্গা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আসার পর প্রথম জায়গায় বসবাস শুরু করছে, তারপর তাদের সেখান থেকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এক জায়গায় টিউবওয়েল বসিয়ে আবার সেই টিউবওয়েল উঠিয়ে দেওয়া বা অকেজো করে দেওয়া হচ্ছে। সমন্বয়ের জন্য রোহিঙ্গা রিফিউজি রিপাট্রেশন কমিশন তৈরি করা হয়েছে, সেটি যত দ্রুত সমন্বয়ের কাজ শুরু করবে ততই ভালো।’

স্থানীয় এনজিওগুলোকে নির্দেশনা না দিলে তারা এই বড় সংকটে কর্মসূচি চালাতে পারবে না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সামলানোর কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের নেই উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমন্বয়হীনতা থাকবে, সবার একই রকম সামর্থ্য থাকবে তাও না। তবে আন্তর্জাতিকভাবে কাজটি যেহেতু মনিটরিংয়ের বিষয় আছে সেহেতু সতর্ক থাকার বিষয় আছে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা পক্ষান্তরে সরকারকেই নিতে হবে।’ 

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

জাতিসংঘ শিশু তহবিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফারিয়া সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশনের জন্য এনজিওগুলোর গ্রুপ করা হয়েছে। প্রতিদিন তাদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে তাদের কার্যক্রমে একটার সঙ্গে আরেকটা ছাপিয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। আগামী ছয় মাস কী ধরনের সহায়তা লাগবে তার একটি অনুমান নির্ভর পরিকল্পনা করে সেটিকে সামনে রেখে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সমন্বয়হীনতার কোনও অভিযোগ ওঠার কথা না।’

সমন্বয়হহীনতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার প্রিয়াঙ্কা ফারজানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। ৬ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ বিষয় নয়। সবার কাছে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এমনও বলা যাবে না, কিন্তু ৭০-৮০ শতাংশ সম্ভব হচ্ছে।’

একই এলাকায় একাধিক এনজিও একই কাজ করায় কোনও ধরনের সমস্যা হচ্ছে কিনা-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এত ছোট জায়গায় এত বিশাল জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনাটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

 

 

/ইউআই/ এমও/এসটি/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
প্রবীণদের প্রতি দায় ও ভালোবাসার সংস্কৃতি গড়ে তুলি
বিশ্ব প্রবীণ দিবস প্রবীণদের প্রতি দায় ও ভালোবাসার সংস্কৃতি গড়ে তুলি
কোচের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ? জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়লেন রোনালদো
কোচের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ? জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়লেন রোনালদো
রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারেন না মিমি, কীসের ভয় অভিনেত্রীর
রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারেন না মিমি, কীসের ভয় অভিনেত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
পুলিশ পরিদর্শককে কল করে এমপি বললেন ‘এসব ফাইজলামি বাদ দেন’
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে কল করে যা বললেন মন্ত্রী
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর ফোন, জিএম বরখাস্ত
প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলা উচ্চারণ’ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য, স্কুলশিক্ষক আটক
প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলা উচ্চারণ’ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে মন্তব্য, স্কুলশিক্ষক আটক
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ