প্রতিবন্ধিতা কোনও সমস্যা নয়। সহযোগিতা পেলে যে কেউই ভালো করবে। এখন দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। রবিবার (০৩ ডিসেম্বর) ২৬তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস ও ১৯তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসে ‘সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ ও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করে সাফল্য পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্তরা বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন।
সিরাজগঞ্জের শারীরিক প্রতিবন্ধী সাবিনা আক্তার শিলা বলেন, ‘আজ অর্থমন্ত্রীর হাত থেকে এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পেরে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি; আজ তার মূল্যায়ন পেলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমিও একসময় একজন পিছিয়ে থাকা প্রতিবন্ধী নারী ছিলাম। আমার পরিবার থেকে উৎসাহ দেয় সংগঠনে আসার জন্য। সংগঠনে আসার পর আমার জীবনে পরিবর্তন শুরু হয়। এখন আমি পিছিয়ে থাকা প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কাজ করি।’
শিলা ২০০৮ সালে সমাজসেবা অধিদফতর থেকে এসিডদগ্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন তহবিল থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে মুদি-মনোহরি ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যবসায় তিনি সফলতা পান। এরপর শুরু করেন টিস্যু কাপড়ের ব্যাগ তৈরির কাজ। পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন।
শিলার সঙ্গে ‘সফল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ হিসেবে আরও দুজন পুরস্কার পেয়েছেন। তারা হলেন বরিশালের বদিউল আলম ও ঢাকার মহুয়া পাল।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বদিউল আলম ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করছেন।
আর শারীরিক প্রতিবন্ধী মহুয়া পাল এক্সেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সাল থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। সংস্থার মাধ্যমে তিনি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, টিউশন ফি, থেরাপি সার্ভিস, সহজ চলাচলের জন্য সহায়ক উপকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং কর্মসম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। দীর্ঘ ২৫ বছর সিআরপিতে কাজ করেছেন তিনি।
প্রতিবন্ধিতা উত্তরণে কাজ করেন এমন সফল ব্যক্তি হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আল মামুন সরকার, খুলনার মাহবুবা চৌধুরী ও ময়মনসিংহের ড. অঞ্জন কুমার চিচাম।
আল মামুন সরকার একজন সমাজকর্মী। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক শিশু, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সেবা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। আসমাতুন নেসা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুল, বিজেশ্বর সনি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল এবং আসমাতুন নেসা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রাবাস স্থাপন ও পরিচালনা করছেন তিনি।
মাহবুবা চৌধুরী প্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৫ সালে হিচাক বা হিয়ারিং ইম্পিয়ার্ড চিলড্রেন অ্যান্ড হিয়ারিং এইড সেন্টার গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের হিয়ারিং টেস্ট করে হিয়ারিং এইড দেওয়া হয়। পুরস্কার প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অনেক আনন্দ লাগছে। এটা আমার কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বড় মেয়ে শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়ে কাজ করতে করতে অন্য শিশুদের জন্য কাজ করা শুরু করি। এখন বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। আমার ছোট মেয়ে প্রিয়া একজন মডেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘৩০ বছর আগে বড় মেয়ে ও অন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। এখন দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। এখন প্রতিবন্ধীরা ভাতা পাচ্ছে। তারা স্কুলে যেতে পারছে। গরিব হলেও তারা অনেক সুযোগ পাচ্ছে। আশা করি ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধীদের জন্য আরও সুযোগ বাড়বে।’
ড. অঞ্জন কুমার চিচাম প্রতিবন্ধী কমিউনিটি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কাজ করে এ সংগঠন। তিনি তাদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়ক উপকরণ সরবরাহ এবং চিকিৎসা সেবাদানে সহায়তা করেন।
প্রতিবন্ধিতা উত্তরণে কাজ করে এমন সফল প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে ঢাকা থেকে সূচনা ফাউন্ডেশন, সিলেট থেকে জিডিএফ ও লালমনিরহাট থেকে সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্যা ইন্টেলেকচুয়ালি ডিসঅ্যাবল (সুইড বাংলাদেশ, লালমনিরহাট শাখা)।
সূচনা ফাউন্ডেশন নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার (এনডিডি) এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অ্যাডভোকেসি, গবেষণা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত অলাভজনক বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। এটি মানসিক স্বাস্থ্য এবং নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পথচলায় সহযোগিতা করে, যেন তারা আর্থিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমাজের উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে।
জিডিএফ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিচালনা করে। বই বাঁধা, কম্পিউটার শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার সচেতনতা ও নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করে এই সংগঠন।
সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্য ইন্টেলেকচুয়ালি ডিসঅ্যাবল প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন এবং খেলাধুলায় অনন্য অবদান রেখেছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা বিশ্ব স্পেশাল অলিম্পিকে অংশ নিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছে।
সুইড বাংলাদেশ লালমনিরহাট শাখার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী অটিস্টিক বিদ্যালয় ও বার্ন হার্ট কিন্ডারগার্টেনের অধ্যক্ষ স্বপ্না জামান। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজটি শুরু করেছিলাম ১৯৮৩ সালে। তখন পুরস্কার পাওয়ার জন্য করিনি। তবে, অ্যাওয়ার্ড পেয়ে ভাল লাগছে। দায়বদ্ধতা বেড়ে গেছে। ১৯৮৩ সালে আমরা মাত্র পাঁচ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। একজন ড্যানিশ ভদ্রমহিলা লিজবার্ন হার্ড, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তখন আমার বয়সও অনেক কম ছিল। কিন্তু পরে এক অদৃশ্য শেকলে জড়িয়ে পড়ায় আমার আর এখান থেকে সরে যাওয়া হয়নি। পরে এই স্কুলের জন্য এনজিও ফান্ড দিয়েছে। আমরা নিজেরা ট্রেনিং নিয়েছি। স্কুলের শিক্ষকদের ট্রেনিং দিয়েছি। এখানে ট্রেনিং ছাড়া, ধৈর্য ছাড়া কাজ করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশুদের আমাদের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে। বিষয়টা তখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। তাদের সমাজে মেশাতে হবে। তখন এই শিশুদের নিয়ে আমরা মাঠে যেতে পারতাম না। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই পর্যন্ত এসেছি। আমাদের একটি শিশু স্পেশাল অলিম্পিকে চারবার অংশ নিয়েছে। অনেক শিশুকে আমরা পুনর্বাসিত করেছি। এনজিওর মাধ্যমে ট্রেনিং নিয়ে অনেকে বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। আমরা স্কুলের জন্য জমি নিয়েছি। তিনতলা ভবন করেছি। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে স্পেশাল এডুকেশনের শিশুদের সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছি।’ তিনি জানান, তাদের স্কুলে সাধারণ শিক্ষার্থী আছে ২০২ জন, আর স্পেশাল শিক্ষার্থী আছে ১৫৭ জন। এর মধ্যে ৭৫ জন নিয়মিত স্কুলে আসে। বাকিদের বাড়িতে ফিল্ড টিচার গিয়ে শিক্ষা দেয়। এটাকে বলা হয় গৃহভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম। স্কুলটিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯ জন এবং অন্যান্য শাখার জন্য ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধী স্কুলের খবর।








