বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করছেন। এ জন্য তারা সময় সংকুলানের চাপে পড়ছেন। এ কারণে নারীরা ঘুম, বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত সেবার জন্য কম সময় পান। যদিও আইএলও-এর মানদণ্ড অনুযায়ী একজন ব্যক্তির সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করার কথা। শনিবার ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও গৃহস্থালি সেবামূলক কাজ: নীতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরেছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের নীতি ও আইনে নারীর সেবামূলক কাজের পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন নারী প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা সেবামূলক কাজ করেন। অথচ তার পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন পান না। কারণ দেশের নীতি ও আইনে নারীর ঘরের কাজের মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও পুনর্বণ্টনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই। ফলে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন এখনও অনেক দূরের বিষয়। এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মূল প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তাদের ওপর গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের অসম চাপ।
অ্যাকশনএইড-এর পাওয়ার প্রকল্পের আওতায় করা এই গবেষণায় বলা হয়েছে, নেপালের নারীরা গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে দৈনিক ৬ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। বাংলাদেশের নারীদের প্রতিদিন ৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা সময় দিতে হয় সেবামূলক কাজে। আর ভারতের নারীরা ব্যয় করেন দৈনিক ৫ দশমিক ১ ঘণ্টা। যেখানে এই কাজে পুরুষরা সময় দেন যথাক্রমে নেপাল ২ দশমিক ২ ঘণ্টা, বাংলাদেশ ১ দশমিক ১ ঘণ্টা ও ভারতে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ ঘণ্টা। এই বিষয়ে পাকিস্তানের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর প্রধান গবেষক ড. সিমিন মাহমুদ বলেন, ‘এমনিতেই নারীরা ঘরে অনেক কাজ করেন। পাশাপাশি আরও অনেক কাজ করতে হয় তাদের। সবমিলিয়ে পুরুষের চেয়েও বেশি কাজ করেন নারীরা। ফলে ঘরের কাজ নিয়ে অসম চাপে পড়েন তারা।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের অনেক নীতি ও আইন আছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, জাতীয় শ্রমিক নীতি ২০১২, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ ও গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতি। এই নীতিগুলোয় সুনির্দিষ্টভাবে পরিবারের সেবামূলক কাজের মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও পুনর্বণ্টনের কোনও বিষয় নেই।
অনুষ্ঠানে সার্ক ও বিমসটেক-এর মহাপরিচালক মো. শামসুল হক বলেন, ‘সার্ক-এর বেশ কিছু নীতিতে নারী উন্নয়নের কথা বলা আছে। তবে নারীর ঘরের কাজের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দরকার। তা না হলে তারা পিছিয়ে পড়বেন।’
গবেষণায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। নারীর গৃহস্থালির সেবামূলক কাজকে স্বীকৃতি, হ্রাস ও পুনর্বণ্টনের বিষয়কে আঞ্চলিক নীতি-কাঠামো এবং জাতীয় নীতিগুলোয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; যেমন জিডিপিতে এই শ্রমকে বিবেচনায় আনা। সুপারিশে আরও বলা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর পরিচয়কে যে সব আন্তঃসম্পর্কিত বিষয় প্রভাবিত করে, সে বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে দেশের আইন ও নীতিতে যুক্ত করা দরকার।
গবেষণার প্রতিবদন ও পরিবারে নারীর সেবামূলক কাজ নিয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমরা গৃহস্থালির কাজকে সম্মান করি না এবং ধরে নেওয়া হয় যে, এটা নারীর কাজ। একদিকে নারী পরিবার বা সমাজে তার কাজের মূল্যায়ন পান না, অন্যদিকে রাষ্ট্র তার নীতি ও আইনে মূল্যায়নের বিষয়টি উপেক্ষা করছে।’








