সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হলে তাদের পরিবার সদস্যদের ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে মোটরযান ট্রাইব্যুনালে যেতে বলা হয়। কিন্তু এ ট্রাইব্যুনালটি কোথায় তারা তা সহজে খুঁজে পান না। সবাই পাল্টা প্রশ্ন করেন, কোথায় সে ট্রাইব্যুনাল? আইনজীবীরা বলছেন, মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী এবিষয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ থাকলেও তা আদৌ গঠন হয়নি। যদি হতো, তাহলে ট্রাফিক অপরাধগুলো হালকা করে দেখার যে প্রবণতা ক্ষমতাবানদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সেটি থাকতো না। আইনেও পরিবর্তন আনা জরুরি উল্লেখ করে তারা বলছেন, বিদ্যমান আইনে ক্ষতিপূরণ এর যেটুকু নির্দেশনা আছে সেটিরও যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর (নিসচা) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ১৪৪ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ২৫৫ জন আহত হয়েছেন৷ ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার তিনজন৷আমাদের দেশের বেশ কয়েকজন তারকাকেও হারাতে হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ঘটনা বিরল। ১৯৮৯ সালে মিনিট্রাকের চাপায় দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু নিহত হওয়ার ঘটনায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১০ সালে ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই ক্ষতিপূরণের টাকা আজও তার পরিবার পায়নি। সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ক্ষতিপূরণ হিসাবে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেশের প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। আইনের এই বিধানটি কার্যকর হয়নি। আর সে কারণে যারা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত হচ্ছেন তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করে ট্রাইব্যুনালে যেতে পারছেন না। ট্রাইব্যুনাল গঠন হলে সেখানে ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করার সুযোগ পাবেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত জানায়, অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানোর ফলে দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটছে৷ আমাদের দেশে ‘মোটর ভেহিক্যালস অধ্যাদেশ ১৯৮৩' নামে একটি আইন রয়েছে৷ কিন্তু ওই আইন না জানার কারণে তারা কখনও আদালতে আসেননি৷ তবে এই রায়ের পর থেকে ভবিষ্যতে তাদের আদালতে আসার সুযোগ সৃষ্টি হলো৷
আর এর মাধ্যমে নতুন করে আবারও মোটরযান ট্রাইব্যুনালের কথা ওঠা জরুরি উল্লেখ করে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী রমজান আলী সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মোটরযান ট্রাইব্যুনাল হলে ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো আরও সহজ হবে। এখনও ট্রাইব্যুনাল না থাকায় করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলা করতে হলে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে যতদিন না ট্রাইব্যুনাল হচ্ছে ততদিন জেলা জজ আদালতে হাজির হতে হবে।
মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল এখনও গঠন করা হয়নি। তবে মোটরযান বিষয়ক অপরাধ সুরাহার জন্য এধরনের ট্রাইব্যুনাল হলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, ‘সড়ক নিরাপদ করার ক্ষেত্রে আইনের যে বিধি বিধান সেখানে লাইলেন্সহীনতা থেকে শুরু করে দুর্ঘটনার যে অপরাধের বর্ণনা, সেটা ৩০৪ এর ক ধারায় ফেলা হয়। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবসময় এটি নেগলিজেন্স এর কারণে ঘটছে তা নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইচ্ছেকৃত অপরাধও হয় সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা যারা এই মামলাগুলো নিয়ে কাজ করছি তারা এসব জায়গাতে ফৌজদারি অপরাধ ঘটলেও আইনি দুর্বলতা দেখতে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে ক্ষতিপূরণ এর যেটুকু নির্দেশ আছে সেটিরও প্রয়োগ হচ্ছে না। ট্রাফিক সংক্রান্ত অপরাধগুলো অপরাধ হিসেবে দেখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় রাজি হন না। ক্ষমতাবানদের মধ্যে বিষয়গুলো সিরিয়াসলি নেওয়ার প্রবণতাও নেই। ট্রাইব্যুনাল থাকলে সিরিয়াসলি দেখা হবে বলে মনে হয়। কেননা, মানসিক ক্ষতির দিকগুলো ধর্তব্যে নেওয়া হয় না। ফলে হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বিষয়গুলো আদতে কতটা ফেলনা তা বিবেচনায় নিয়ে আইনে পরিবর্তন দরকার। ট্রাইব্যুনাল হলে মামলাকে দ্রুত সমাধানের দিকে নেওয়া সম্ভব হতো।
এবিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল হয়েছে কিনা আমাকে জেনে জানাতে হবে।’








