এ বছরই রাজধানীর জুম বাংলাদেশ স্কুলে প্লে গ্রুপে ভর্তি হয়েছে চার বছরের মাহাদী। বইমেলার দ্বিতীয় দিনেই বাবার সঙ্গে সে হাজির শিশু প্রহরে। এ স্টল ও স্টল ঘুরে দু’টি বই পছন্দ হলো তার। ‘মিনি ও হাঁসের ছানা’ ও ‘একাকি বসে আছি’ বই দু’টি কিনে দিলেন মাহাদীর বাবা রাসেল। নতুন বই পেয়ে মাহাদীর খুশি যেন আর ধরে না।
একটু পাশেই স্বরবৃত্ত প্রকাশনীর স্টলে ছোট ভাই সাজিদকে (৫) নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ১১ বছরের মাহিয়াকে। মায়ের সঙ্গে তারা এসেছে বইমেলায়। মাহিয়ার ভাষ্য, ‘সকালে জাদুঘর দেখতে এসেছিলাম। সেখান থেকে চলে এসেছি বইমেলায়।’ কী বই পড়তে ভালোবাসো— জানতে চাইলে মাহিয়ার চটপট জবাব, ‘ভূতের বই পড়তে খুব ভালো লাগে। মুক্তিযুদ্ধের বই পড়তেও ভালো লাগে। এছাড়া, রাজকন্যাদের বই, রূপকথার বইও আমার খুব পছন্দ।’
মাহিয়ার সঙ্গে যখন কথা হয়, তখনও কোনও বই কেনা হয়নি তার। তবে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কয়েকটি বই তার পছন্দ হয়েছে। আরও স্টল ঘুরে সব বই দেখে তারপর সেখান থেকে বাছাই করে বই কিনে দেওয়ার জন্য মা’কে বলবে— জানালো মাহিয়া।
আড়াই বছরের আয়ুশীকে নিয়ে মেলায় এসেছেন তাসনিম আফরোজ। তিনি জানালেন, এরই মধ্যে ‘টু ফিশ অ্যান্ড ফ্রগ’, ‘দ্য ফক্স অ্যান্ড দ্য স্ট্রোক’, ‘দ্য র্যা টস অ্যান্ড দ্য এলিফ্যান্ট’, ‘চেনা প্রাণীর অজানা কথা’সহ বেশ কয়েকটি বই কিনেছেন মেয়ের জন্য। সব মিলিয়ে আয়ুশীর জন্য কত টাকার বই কিনলেন— জানতে চাইলে তাসনিম বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার টাকার বই কিনেছি। তেমন পছন্দ হলেও আরও কিনবো।’
বইমেলার দ্বিতীয় দিনে সকালেই উত্তরা থেকে হাজির দুই বোন সাত বছরের সৃজন ও চার বছরের মানহা। তাদের সঙ্গে থাকা বাবা-মা জানালেন, বইমেলা এলেই অন্তত একটি শুক্র বা শনিবার তাদের মেলাতে আনতেই হয়। শিশু চত্বরে ‘টুকটুকি’, ‘হালুম’, ‘সিকু’, ‘ইকড়ি’সহ সিসিমপুরের বন্ধুরা মেলায় হাজির হয় শিশুদের আনন্দ দিতে। বাসায় বসে যেমন সৃজন-মানহা সিসিমপুর দেখে ইউটিউবে, বইমেলায় তারা সরাসরি হাজির হয় বলে তাদের দেখার জন্যও তারা উৎসুক থাকে।
মাহাদী, মাহিয়া, সাজিদ, আয়ুশী, সৃজন, মানহা’র মতো এমন অনেক শিশুর পদচারণায় মুখর ছিল সদ্য শুরু হওয়া বইমেলার দ্বিতীয় দিনের প্রথম প্রহর। শুক্র ও শনিবার শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন নিয়ে ‘শিশু প্রহর’ নামের এই সময়টিতে বরাবরই থাকে শিশুদের ভিড়। এবারের মেলার দ্বিতীয় দিন শুক্রবারেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
মেলা ঘুরে দেখা গেলো, শিশুদের কেউ এসেছে বাবার সঙ্গে, কেউ এসেছে মায়ের সঙ্গে, কেউ বড় ভাই কিংবা পরিবারের অন্য বড় কোনও সদস্যদের সঙ্গে। শিশুদের বইয়ের সমাহার নিয়ে হাজির হওয়া স্টলগুলোতে গুটি গুটি পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা, পছন্দ করছে বই। বাজেট অনুযায়ী কেনাও হচ্ছে একটি-দু’টি। পরে কোনও একদিন এসে কিনবে বলে কেউ কেউ আজকের দিনটি কেবল বই দেখেই কাটিয়ে দিচ্ছে।
আজ শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় মেলার গেট খুলেছে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র। এরপর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ছিল ‘শিশু প্রহর’। শিশুদের নিরাপদে বই কেনার লক্ষ্যেই এই আয়োজন। এছাড়া, শিশুদের আনন্দ দিতে শিশু চত্বরের মঞ্চে সিসিমপুরের বন্ধুরা তো ছিলই। ‘টুকটুকি’ ‘হালুম’, ‘সিকু’, ‘ইকড়ি’রা যখন মঞ্চে নাচ-গানে ব্যস্ত, মঞ্চের চারপাশে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা ছানাপোনাদের তখন উল্লাস যেন বাধ মানে না।
বইমেলার দ্বিতীয় দিন হওয়ায় এখনও বেশকিছু স্টলের কাজ চলছে। সকাল-সকাল মেলায় তেমন ভিড় ছিল না। শিশুদের স্টলগুলো বাদ দিলে কিছু স্টলে দুয়েকজন ক্রেতা দেখা গেলেও বেশিরভাগ স্টলই ছিল ফাঁকা। শুধু বিক্রেতারা বসে আছেন। কোনও কোনও স্টলে বিক্রেতাদের বই সাজানোও শেষ হয়নি এখনও।
যুক্ত প্রকাশনীর স্টলে ছিলেন ঊর্মি লোহানী। দুপুর ১২টার দিকে কথা হয় তার সঙ্গে। জানালেন, তখন পর্যন্ত মাত্র দু’টি বই বিক্রি হয়েছে তাদের— ‘সুকুমারের ছড়া’ ও ‘ঈশপের গল্প’। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিক্রি বাড়বে বলে আশাবাদ জানান তিনি।
স্বরবৃত্ত প্রকাশনের বিক্রেতা আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘মেলার দ্বিতীয় দিন হিসেবে বিক্রি মোটামুটি হচ্ছে। শিশুরা ভূতের বই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেলা আস্তে আস্তে জমে উঠবে। আজ তো দ্বিতীয় দিন। সকাল থেকে আকাশ বেশ মেঘলা ছিল, তাই মেলায় ভিড় কম।’
এদিকে, শিশু প্রহরে মোড়ক উন্মোচন হলো শিশু লেখক অলীন বাশারের দুইটি বইয়ের। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর মোট পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এবারের মেলায় এসেছে তার দুইটি বই— ‘পালোয়ানের হার’ ও ‘ভূতের টিউশনি’। অলীন বাশারের ভাষ্য, ‘আমারলিখতে ভালো লাগে, তাই লিখি।’ মেলায় তার লেখা বই অন্য সবাই কেনে— এটাও তাকে খুব আনন্দ দেয় বলে অভিমত এই ক্ষুদে লেখকের।
অলীন বাশারের বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে যোগ দেন সাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘অলীনের নাম রেকর্ডে ওঠানোর সময় হয়েছে। এখানে যেসব বাবা-মা উপস্থিত আছেন, তাদের বলবো— সন্তানদের ভাব প্রকাশে উৎসাহিত করুন। শিশুদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই অভ্যাস শিশুদের বিকাশের জন্য খুবই জরুরি।’








